বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখ। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) ছিল…
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে একটি নিবন্ধ লিখ।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ (১৯৭১) ছিল বাঙালি জাতির অধিকার প্রতিষ্ঠা ও স্বাধীনতা অর্জনের এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম। দীর্ঘ ২৩ বছরের বঞ্চনা, শোষণ ও রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের ফলস্বরূপ এই যুদ্ধ বাঙালি জাতিকে একটি স্বাধীন রাষ্ট্র উপহার দেয়। এই নিবন্ধে মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি, ঘটনাবলী ও তাৎপর্য আলোচনা করা হলো।
মুক্তিযুদ্ধের পটভূমি ও কারণসমূহ
মুক্তিযুদ্ধের মূল কারণগুলো ছিল গভীর ঐতিহাসিক, অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক।
১. দ্বি-জাতিতত্ত্বের ব্যর্থতা
১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় দ্বি-জাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে সৃষ্ট পাকিস্তান রাষ্ট্র শুরু থেকেই বাঙালি জাতিসত্তাকে উপেক্ষা করে। পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে সাংস্কৃতিক, ভৌগোলিক ও অর্থনৈতিক পার্থক্য ছিল বিশাল।
২. ভাষা আন্দোলন ও বাঙালি জাতীয়তাবাদের উত্থান
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন ছিল বাঙালি জাতিসত্তার প্রথম সুস্পষ্ট প্রতিবাদ। উর্দু ভাষাকে রাষ্ট্রভাষা করার চেষ্টার বিরুদ্ধে এই আন্দোলন বাঙালি জাতীয়তাবাদকে দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করে।
৩. অর্থনৈতিক শোষণ ও বৈষম্য
দীর্ঘ ২৩ বছর ধরে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী পূর্ব পাকিস্তানের সম্পদ পাচার করে এবং অর্থনৈতিক নীতি প্রণয়নে পূর্ব পাকিস্তানকে সুবিধাবঞ্চিত করে রাখে। এই অর্থনৈতিক বৈষম্য ক্ষোভের জন্ম দেয়।
৪. রাজনৈতিক অধিকার হরণ
কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা কুক্ষিগত করা, সামরিক শাসন জারি এবং গণতন্ত্রের চর্চায় বাধা সৃষ্টি করে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকরা বাঙালিদের রাজনৈতিক অধিকার ক্রমাগত হরণ করে।
৫. ছয় দফা আন্দোলন ও নির্বাচনের রায় উপেক্ষা
১৯৬৬ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘোষিত ছয় দফা কর্মসূচি ছিল বাঙালির মুক্তির সনদ। ১৯৭০ সালের সাধারণ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করলেও পাকিস্তানি সামরিক জান্তা ক্ষমতা হস্তান্তর করতে অস্বীকার করে।
প্রধান ঘটনাবলী ও সামরিক সংঘাত
নির্বাচনের ফলাফল অস্বীকার করার পর থেকেই পরিস্থিতি দ্রুত সংঘাতের দিকে মোড় নেয়।
১. ২৫শে মার্চের কালরাত্রি
১৯৭১ সালের ২৫শে মার্চ রাতে পাকিস্তান সেনাবাহিনী নিরস্ত্র বাঙালির উপর ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামে গণহত্যা শুরু করে, যা ছিল মূলত বাঙালি নিধনযজ্ঞ।
২. স্বাধীনতার ঘোষণা
২৬শে মার্চ প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন (বার্তাটি পরে কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে প্রচারিত হয়)। এই ঘোষণার পর থেকেই মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়।
৩. মুজিবনগর সরকার গঠন
১০ই এপ্রিল, ১৯৭১ তারিখে গঠিত হয় মুজিবনগর সরকার (অস্থায়ী সরকার), যা ১৭ই এপ্রিল আনুষ্ঠানিকভাবে শপথ নেয়। এই সরকার যুদ্ধ পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৪. সামরিক বাহিনী ও মুক্তি বাহিনী গঠন
মুক্তিযুদ্ধের জন্য বাংলাদেশ সামরিক বাহিনী এবং মুক্তি বাহিনী (নিয়মিত ও অনিয়মিত যোদ্ধা) গঠিত হয়। পুরো দেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে যুদ্ধ পরিচালনা করা হয়।
৫. আন্তর্জাতিক সমর্থন ও বিরোধিতা
মুক্তিযুদ্ধের সময় ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়ন কূটনৈতিক ও সামরিক সমর্থন প্রদান করে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র ও চীন পাকিস্তানের পক্ষ অবলম্বন করে, যদিও তারা শেষ পর্যন্ত সামরিক হস্তক্ষেপ করেনি।
৬ ভারতীয় বাহিনীর যোগদান ও যৌথ বাহিনী গঠন
৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে ভারত সরাসরি যুদ্ধে যোগ দিলে বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ কমান্ডে ‘মিত্রবাহিনী’ গঠিত হয়। এটি যুদ্ধের গতিকে দ্রুত স্বাধীনতার দিকে নিয়ে যায়।
৭. বুদ্ধিজীবী হত্যা
বিজয়ের প্রাক্কালে, ১৪ই ডিসেম্বর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী এবং তাদের সহযোগী আল-বদর ও আল-শামস বাহিনী দেশের শ্রেষ্ঠ বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করে জাতিকে মেধাশূন্য করার চেষ্টা করে।
৮. ১৬ই ডিসেম্বরের বিজয়
১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ঢাকার রেসকোর্স ময়দানে (বর্তমানে সোহরাওয়ার্দী উদ্যান) পাকিস্তান সামরিক বাহিনীর প্রধান জেনারেল এ. এ. কে. নিয়াজী যৌথ বাহিনীর কাছে আনুষ্ঠানিকভাবে আত্মসমর্পণ করেন। এর মাধ্যমে স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশ আত্মপ্রকাশ করে।
মুক্তিযুদ্ধের ফলাফল ও তাৎপর্য
মুক্তিযুদ্ধের সুদূরপ্রসারী ফল ও তাৎপর্য বাঙালি জাতির ইতিহাসে চিরস্মরণীয়।
১. স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা
মুক্তিযুদ্ধের সবচেয়ে বড় অর্জন হলো একটি স্বাধীন রাষ্ট্র, গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা। বাঙালি জাতি নিজস্ব একটি মানচিত্র, পতাকা ও সংবিধান লাভ করে।
২. বাঙালি জাতীয়তাবাদের চূড়ান্ত বিজয়
এই যুদ্ধ বাঙালির ভাষাভিত্তিক জাতীয়তাবাদকে একটি রাজনৈতিক বিজয় এনে দেয় এবং দীর্ঘদিনের সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বঞ্চনার অবসান ঘটায়।
৩. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি ও মর্যাদা
বাংলাদেশ দ্রুতই বিশ্বের দরবারে একটি নতুন জাতিরাষ্ট্র হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে এবং জাতিসংঘসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার সদস্যপদ অর্জন করে।
উপসংহার
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ বাঙালি জাতির ইতিহাসে শ্রেষ্ঠতম অর্জন ও আত্মত্যাগের প্রতীক। এই বিজয় আমাদের স্বাধীনতা, সংস্কৃতি ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের ভিত্তি রচনা করেছে।
