বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের অবদান আলোচনা কর।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের অবদান আলোচনা কর। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ…
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের অবদান আলোচনা কর।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ (১৯৭১) ছিল আন্তর্জাতিক রাজনীতির এক গুরুত্বপূর্ণ উপাখ্যান। এই মুক্তি সংগ্রামকে কেন্দ্র করে তৎকালীন বৃহৎ শক্তিবর্গ (ভারত, যুক্তরাষ্ট্র, চীন, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাজ্য) এবং আন্তর্জাতিক সংস্থা (যেমন জাতিসংঘ) নিজ নিজ ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ অনুযায়ী সরাসরি বা পরোক্ষভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এখানে মুক্তিযুদ্ধে এই শক্তিগুলোর অবদান বিশদভাবে আলোচনা করা হলো।
১. ভারত:
ভারতের ভূমিকা ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে সবচেয়ে সরাসরি ও গুরুত্বপূর্ণ। ভারত সরকার প্রায় এক কোটি শরণার্থীকে আশ্রয় প্রদান করে এবং তাদের জন্য মানবিক সহায়তা নিশ্চিত করে।
- সামরিক সমর্থন: ভারত সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের সামরিক প্রশিক্ষণ, অস্ত্র ও সরঞ্জাম সরবরাহ করে।
- কূটনৈতিক তৎপরতা: প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধী আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের পক্ষে জোরদার জনমত গঠনে নেতৃত্ব দেন এবং বিভিন্ন দেশের সমর্থন আদায় করেন।
- সরাসরি যুদ্ধ: ৩রা ডিসেম্বর, ১৯৭১ সালে পাকিস্তান ভারতের বিমান ঘাঁটিতে হামলা করলে ভারত সরাসরি যুদ্ধে যোগ দেয়। ভারতীয় সামরিক বাহিনীর (মিত্রবাহিনী) অংশগ্রহণে মাত্র ১৩ দিনের মধ্যে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য হয়, যা বিজয়কে নিশ্চিত করে।
২. সোভিয়েত ইউনিয়ন (রাশিয়া):
তৎকালীন সোভিয়েত ইউনিয়ন (USSR) ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে এবং ভারতের প্রধান সমর্থক।
- জাতিসংঘে ভিটো: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদে সোভিয়েত ইউনিয়ন বাংলাদেশের স্বাধীনতা বিরোধিতাকারী এবং যুদ্ধবিরতির জন্য আনা মার্কিন প্রস্তাবগুলোর বিরুদ্ধে বারবার ভিটো ক্ষমতা ব্যবহার করে। এটি ভারতকে সামরিক পদক্ষেপের জন্য সময় ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছিল।
- নৌ-প্রতিরোধ: যুক্তরাষ্ট্রের সপ্তম নৌবহর যখন বঙ্গোপসাগরের দিকে আসছিল, তখন সোভিয়েত নৌবহর পাল্টা মহড়ার মাধ্যমে মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের হুমকিকে প্রশমিত করতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
৩. যুক্তরাষ্ট্র:
যুক্তরাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল দ্বিধাবিভক্ত ও বিতর্কিত। রাষ্ট্রপতি রিচার্ড নিক্সন এবং নিরাপত্তা উপদেষ্টা হেনরি কিসিঞ্জার ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থে পাকিস্তানের পক্ষ নেন।
- পাকিস্তানের সমর্থন: চীন ও পাকিস্তানের সাথে সুসম্পর্ক বজায় রাখার স্বার্থে যুক্তরাষ্ট্র পাকিস্তানকে সামরিক ও অর্থনৈতিক সহায়তা প্রদান অব্যাহত রাখে।
- সপ্তম নৌবহরের আগমন: ভারতকে ভীত ও চাপ সৃষ্টি করার উদ্দেশ্যে যুক্তরাষ্ট্র পারমাণবিক অস্ত্রে সজ্জিত সপ্তম নৌবহরকে বঙ্গোপসাগরে পাঠায়, যদিও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরোধিতার কারণে এটি নিষ্ক্রিয় ছিল।
- জনমত ও কংগ্রেসের সমর্থন: যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণ এবং কংগ্রেসের কিছু অংশ পাকিস্তানের মানবাধিকার লঙ্ঘনের তীব্র সমালোচনা করে এবং শরণার্থীদের জন্য ত্রাণ সহায়তা প্রদানে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করে।
৪. গণপ্রজাতন্ত্রী চীন:
চীন, তৎকালীন সময়ে সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে আদর্শগত বিরোধের কারণে, পাকিস্তানের পক্ষ নেয়।
- রাজনৈতিক বিরোধিতা: চীন জাতিসংঘে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকে সমর্থন করে তোলা প্রস্তাবগুলোর বিরোধিতা করে এবং পাকিস্তানের অখণ্ডতার পক্ষে বক্তব্য রাখে।
- অপ্রত্যক্ষ সমর্থন: চীন পাকিস্তানকে সামরিক ও কূটনৈতিক সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেও, চূড়ান্ত সামরিক সংঘাতে তারা সরাসরি কোনো ভূমিকা পালন করেনি, যা যুদ্ধের ফলাফলে বড় পরিবর্তন আনতে পারেনি।
৫. যুক্তরাজ্য (UK):
যুক্তরাজ্যের ভূমিকা ছিল অপেক্ষাকৃত নিরপেক্ষ কিন্তু সহানুভূতিশীল।
- রাজনৈতিক চাপ: ব্রিটিশ সরকার পাকিস্তানের উপর রাজনৈতিক চাপ বজায় রেখেছিল যাতে তারা পূর্ব পাকিস্তানে একটি রাজনৈতিক সমাধান খোঁজে।
- প্রচার ও সচেতনতা: ব্রিটিশ গণমাধ্যমগুলো গণহত্যার খবর প্রকাশ করে বিশ্ব জনমত গঠনে সহায়তা করে।
- মানবিক সহায়তা: বাংলাদেশ ও ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য যুক্তরাজ্য উল্লেখযোগ্য মানবিক সহায়তা প্রদান করে।
৬. জাতিসংঘ (UN):
জাতিসংঘ সরাসরি কোনো পক্ষ না নিলেও যুদ্ধ থামাতে বারবার চেষ্টা করেছিল।
- যুদ্ধবিরতির চেষ্টা: জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ ও সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতি ও মানবিক সংকটের সমাধানের জন্য বিভিন্ন প্রস্তাব আনা হয়, কিন্তু বৃহৎ শক্তিবর্গের (বিশেষত সোভিয়েত ইউনিয়নের ভিটো) মতবিরোধের কারণে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া সম্ভব হয়নি।
- মানবিক কার্যক্রম: আন্তর্জাতিক শরণার্থী সংস্থা ও অন্যান্য অঙ্গসংস্থাগুলো শরণার্থীদের ত্রাণ ও স্বাস্থ্যসেবা প্রদানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
উপসংহার
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে বৃহৎ শক্তিবর্গের অবস্থান ছিল জটিল আন্তর্জাতিক সমীকরণের ফল। যদিও কয়েকটি শক্তির বিরোধিতা ছিল, ভারত ও সোভিয়েত ইউনিয়নের জোরালো সমর্থন দ্রুত স্বাধীনতা এনেছিল এবং মুক্তি অর্জিত হয়েছিল।


