যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ।
যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ। যুক্তফ্রন্ট ছিল ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক…
যুক্তফ্রন্ট সম্পর্কে সংক্ষেপে লিখ।
যুক্তফ্রন্ট ছিল ১৯৫৪ সালের পূর্ববঙ্গ প্রাদেশিক পরিষদের নির্বাচনের জন্য গঠিত একটি ঐতিহাসিক বিরোধী জোট। এটি ছিল তৎকালীন ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগকে ক্ষমতাচ্যুত করার লক্ষ্যে গঠিত পূর্ব বাংলার প্রধান রাজনৈতিক দলগুলোর সমন্বিত একটি মঞ্চ। বাঙালির রাজনৈতিক ইতিহাস, স্বায়ত্তশাসন এবং জাতিসত্তার বিকাশে যুক্তফ্রন্টের অবদান ছিল অপরিসীম।
যুক্তফ্রন্টের জন্ম ও মূল উদ্দেশ্য
১৯৪৭ সালে পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পর থেকেই পূর্ব বাংলার জনগণ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্যের শিকার হচ্ছিল। কেন্দ্রীয় সরকারের মুসলিম লীগ বিরোধী নীতি, বিশেষত ভাষা আন্দোলনের সময়কার দমন-পীড়ন, জনগণের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ সৃষ্টি করে। এই প্রেক্ষাপটে, প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন ও বাঙালির অধিকার প্রতিষ্ঠার উদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী বিরোধী মঞ্চ গঠনের প্রয়োজন দেখা দেয়।
১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর তৎকালীন প্রধান বিরোধী দলগুলো একত্রিত হয়ে যুক্তফ্রন্ট (Jukto Front) গঠন করে। এই জোটের মূল লক্ষ্য ছিল নির্বাচন জেতা এবং বাঙালির দাবিগুলো বাস্তবায়ন করা।
মূল দলসমূহ ও নেতৃত্ব
যুক্তফ্রন্ট প্রধানত চারটি (কোনো কোনো মতে পাঁচটি) বিরোধী দল নিয়ে গঠিত হয়েছিল:
১. আওয়ামী মুসলিম লীগ (নেতৃত্ব: মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ও হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী) ২. কৃষক শ্রমিক পার্টি (নেতৃত্ব: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক) ৩. নেজামে ইসলাম পার্টি (নেতৃত্ব: মাওলানা আতাহার আলী) ৪. গণতন্ত্রী দল
এই জোটের প্রধান তিন নেতা ছিলেন: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী, এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী। তাদের নির্বাচনী প্রতীক ছিল “নৌকা”।
যুক্তফ্রন্টের ২১ দফা কর্মসূচি: বাঙালির মুক্তির সনদ
যুক্তফ্রন্ট নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার জন্য একটি ঐতিহাসিক একুশ দফা (21-Point Programme) কর্মসূচি প্রণয়ন করে, যা ছিল মূলত বাঙালি জাতির অর্থনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মুক্তির সনদ। এই কর্মসূচির মূল বিষয়গুলো ছিল অত্যন্ত জনমুখী।
যুক্তফ্রন্টের গুরুত্বপূর্ণ ৭টি বিষয়
যুক্তফ্রন্টের রাজনৈতিক গুরুত্বকে সংক্ষেপে তুলে ধরতে নিম্নলিখিত বিষয়গুলো বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য:
১. ঐতিহাসিক গঠন: ১৯৫৩ সালের ৪ ডিসেম্বর গঠিত হয়। এর মূল লক্ষ্য ছিল ১৯৫৪ সালের নির্বাচনে মুসলিম লীগকে পরাজিত করে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠা করা।
২. প্রধান নেতা: শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হক, মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী এবং হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দী ছিলেন এই জোটের প্রধান কাণ্ডারি।
৩. একুশ দফা: নির্বাচনী ইশতেহার হিসেবে ২১ দফা কর্মসূচি ঘোষণা করা হয়, যার প্রধান দাবি ছিল বাংলাকে অন্যতম রাষ্ট্রভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া এবং পূর্ববঙ্গকে পূর্ণ স্বায়ত্তশাসন দেওয়া।
৪. নির্বাচনী প্রতীক: এই জোটের নির্বাচনী প্রতীক ছিল “নৌকা”, যা তৎকালীন পূর্ব বাংলার সাধারণ মানুষের কাছে দ্রুত পৌঁছাতে সাহায্য করেছিল।
৫. নিরঙ্কুশ বিজয়: ১৯৫৪ সালের মার্চ মাসের নির্বাচনে যুক্তফ্রন্ট ঐতিহাসিক বিজয় লাভ করে। প্রাদেশিক পরিষদের ২৩৭টি মুসলিম আসনের মধ্যে তারা ২২৩টি আসন জয় করে, যেখানে ক্ষমতাসীন মুসলিম লীগ পায় মাত্র ৯টি আসন।
৬. যুক্তফ্রন্ট সরকার: বিজয়ের পর শেরে বাংলা এ কে ফজলুল হকের নেতৃত্বে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা গঠিত হয়। এই সরকারে শেখ মুজিবুর রহমানও একজন তরুণ মন্ত্রী হিসেবে যোগ দেন।
৭. সরকারের পতন: মাত্র আড়াই মাস পরেই কেন্দ্রীয় সরকারের ষড়যন্ত্রে এবং গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদের হস্তক্ষেপে ১৯৫৪ সালের ৩০ মে যুক্তফ্রন্ট মন্ত্রিসভা বাতিল করে দেওয়া হয়।
যুক্তফ্রন্টের উত্তরাধিকার
মাত্র অল্প সময়ের জন্য ক্ষমতায় থেকেও যুক্তফ্রন্ট বাঙালির মনে আত্মবিশ্বাস ও অধিকার সচেতনতা জাগিয়ে তুলেছিল। ১৯৫৪ সালের নির্বাচন প্রমাণ করে যে পূর্ব বাংলার মানুষ ঐক্যবদ্ধভাবে তাদের অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য প্রস্তুত। এই নির্বাচন পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠীর জন্য একটি স্পষ্ট বার্তা ছিল এবং এটি ছিল পরবর্তীতে ছয় দফা আন্দোলন ও মুক্তিযুদ্ধের মতো স্বাধীনতা অর্জনের সংগ্রামের ভিত্তিপ্রস্তর। যুক্তফ্রন্ট এবং এর একুশ দফা কর্মসূচি আজও বাঙালির জাতীয় ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়।
