লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। এর প্রতিপাদ্য কি ছিল?
লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। এর প্রতিপাদ্য কি ছিল? লাহোর…
লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি আলোচনা কর। এর প্রতিপাদ্য কি ছিল?
লাহোর প্রস্তাব, যা পাকিস্তান প্রস্তাব নামেও পরিচিত, ভারতীয় উপমহাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক যুগান্তকারী দলিল। ১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ লাহোরে অনুষ্ঠিত নিখিল ভারত মুসলিম লীগের বার্ষিক অধিবেশনে এটি উত্থাপিত হয়। এই প্রস্তাব ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র বা রাষ্ট্রসমূহ গঠনের দাবির ভিত্তি স্থাপন করে। এর পটভূমি ছিল বেশ জটিল এবং বহু-কারণনির্ভর।
লাহোর প্রস্তাবের পটভূমি (Background of the Lahore Resolution)
লাহোর প্রস্তাব গৃহীত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণ কাজ করেছিল। নিচে সেই পটভূমি বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
ক) রাজনৈতিক অস্থিরতা ও হতাশা:
১. ১৯৩৫ সালের ভারত শাসন আইন: এই আইনে প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসন দেওয়া হলেও কেন্দ্রে ক্ষমতা হস্তান্তরের প্রশ্নে মুসলিম লীগের মধ্যে গভীর অবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
২. ১৯৩৭ সালের প্রাদেশিক নির্বাচন: নির্বাচনে মুসলিম লীগ প্রত্যাশিত সাফল্য অর্জন করতে পারেনি। কংগ্রেস সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে এবং বেশ কয়েকটি প্রদেশে মন্ত্রিসভা গঠন করে।
৩. কংগ্রেস শাসনের অভিজ্ঞতা: ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সাল পর্যন্ত কংগ্রেস শাসিত প্রদেশগুলোতে মুসলিম লীগ অভিযোগ করে যে, তাদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ করা হয়েছে। যেমন: বন্দে মাতরম গান গাওয়া বাধ্যতামূলক করা, গো-হত্যার ওপর বিধিনিষেধ আরোপ ইত্যাদি।
৪. পীড়িত হওয়ার অনুভূতি: কংগ্রেসের অসাম্প্রদায়িক রাজনীতি সত্ত্বেও, মুসলিম নেতারা অভিযোগ করেন যে, মুসলিমদের সংস্কৃতি ও ধর্মীয় পরিচয়ের প্রতি উপেক্ষা করা হচ্ছে, যা তাদের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা সৃষ্টি করে।
৫. কংগ্রেসের একগুঁয়েমি: কংগ্রেস মুসলিম লীগকে মন্ত্রিসভায় অংশগ্রহণের সুযোগ না দিয়ে এককভাবে ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিল, যা মুসলিম লীগের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদের জন্ম দেয়।
খ) মুসলিম লীগের সাংগঠনিক দৃঢ়তা:
মুহম্মদ আলী জিন্নাহর নেতৃত্ব: ১৯৩০-এর দশকের শেষভাগে মুহম্মদ আলী জিন্নাহর দূরদর্শী ও আপসহীন নেতৃত্বে মুসলিম লীগ একটি শক্তিশালী রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়।
মুসলিম লীগের পুনরুজ্জীবন: ১৯৩৭ সালের নির্বাচনের ব্যর্থতা মুসলিম লীগকে নতুন করে সংগঠিত হওয়ার প্রেরণা যোগায়। তারা মুসলিম জনগণের মধ্যে নিজেদের দাবি প্রতিষ্ঠার চেষ্টা শুরু করে।
গ) আদর্শগত ও তাত্ত্বিক কারণ:
দ্বিজাতি তত্ত্বের বিকাশ: সৈয়দ আহমদ খান প্রথম ভারতীয় মুসলমান ও হিন্দুদের দুটি ভিন্ন জাতি হিসেবে চিহ্নিত করেন। পরবর্তীকালে, মুহম্মদ আলী জিন্নাহ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দ্বিজাতি তত্ত্বকে (Two-Nation Theory) লাহোর প্রস্তাবে প্রতিষ্ঠার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করেন।
স্যার মুহাম্মদ ইকবালের স্বপ্ন: ১৯৩০ সালে আল্লামা ইকবাল তার এলাহাবাদ ভাষণে উত্তর-পশ্চিম ভারতে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্রের ধারণার কথা বলেছিলেন। এই ধারণা মুসলিম মানসে স্বাধীন রাষ্ট্র গঠনের আকাঙ্ক্ষা জন্ম দেয়।
চৌধুরী রহমত আলীর প্রস্তাব: ১৯৩৩ সালে কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র চৌধুরী রহমত আলী প্রথম ‘পাকিস্তান’ (P-Punjab, A-Afghania, K-Kashmir, S-Sindh, TAN-BaluchisTAN) নামে একটি স্বাধীন রাষ্ট্রের দাবি জানান।
ঘ) দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের প্রভাব:
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের শুরু (১৯৩৯): কংগ্রেসের সঙ্গে আলোচনা না করে ভারতকে যুদ্ধে অংশগ্রহণের সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে কংগ্রেস মন্ত্রিসভা পদত্যাগ করে। এতে ভারতে রাজনৈতিক শূন্যতা সৃষ্টি হয়।
১২. মুক্তি দিবস পালন: কংগ্রেসের পদত্যাগে মুসলিম লীগ ‘মুক্তি দিবস’ পালন করে, যা মুসলিমদের মধ্যে স্বস্তি ও আত্মবিশ্বাসের জন্ম দেয়।
১৩. ব্রিটিশের কৌশল: ব্রিটিশ সরকার কংগ্রেসের বিরোধিতা মোকাবিলা করতে মুসলিম লীগকে অধিক গুরুত্ব দিতে শুরু করে, যা জিন্নাহর দর কষাকষির ক্ষমতা বাড়িয়ে তোলে।
লাহোর প্রস্তাবের প্রতিপাদ্য (The Main Tenets of the Lahore Resolution)
১৯৪০ সালের ২৩শে মার্চ, এ.কে. ফজলুল হক কর্তৃক উত্থাপিত এবং মুহম্মদ জাফরুল্লাহ খান কর্তৃক সমর্থিত এই প্রস্তাবের প্রধান প্রতিপাদ্য বা মূল বক্তব্যগুলো নিম্নরূপ ছিল:
- ভৌগোলিক এককগুলির সীমানা পুনর্নির্ধারণ: প্রস্তাবের মূল কথা ছিল, ভৌগোলিকভাবে সংলগ্ন এলাকাগুলোকে প্রয়োজন অনুসারে অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করতে হবে।
- উত্তর-পশ্চিম ও পূর্ব অঞ্চলের স্বাধীনতা: ভারতের উত্তর-পশ্চিম এবং পূর্বাঞ্চলে (যেখানে মুসলমানরা সংখ্যাগুরু) প্রয়োজন অনুযায়ী পরিবর্তন এনে এমনভাবে স্বাধীন রাষ্ট্রসমূহ (Independent States) গঠন করতে হবে, যেখানে সমস্ত ক্ষমতা থাকবে সেই রাষ্ট্রগুলোর হাতে।
- সংবিধানের মৌলিক নীতি: এই অঞ্চলগুলোর সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে যেন মুসলিমরা সংখ্যাগুরু হলেও অন্যান্য সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষা হয়। তাদের ধর্মীয়, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও প্রশাসনিক অধিকার সংবিধানে সুনির্দিষ্টভাবে সংরক্ষিত থাকে।
- ফেডারেল কাঠামোর প্রত্যাখ্যান: এই প্রস্তাব কেন্দ্রে কোনো ফেডারেল শাসনতন্ত্রের (Federal Constitution) অধীনে থাকার ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করেছিল।
উপসংহার
লাহোর প্রস্তাব ভারতের রাজনৈতিক গতিপথ চিরতরে পরিবর্তন করে দেয়। যদিও প্রস্তাবটিতে ‘পাকিস্তান’ শব্দটি ছিল না, তবুও এটিই ছিল দ্বিজাতি তত্ত্বের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি এবং উপমহাদেশে দুটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র সৃষ্টির প্রথম সোপান।

