বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় দাও
বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় দাও ভূমিকা দক্ষিণ এশিয়ার এক ব-দ্বীপ…
বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় দাও
ভূমিকা
দক্ষিণ এশিয়ার এক ব-দ্বীপ রাষ্ট্র বাংলাদেশ, যার ইতিহাস ও সংস্কৃতি হাজার বছরের পুরোনো। বিশ্বের অন্যতম ঘনবসতিপূর্ণ এই দেশের জনগণের মাঝে রয়েছে এক গভীর সাংস্কৃতিক ও নৃতাত্ত্বিক বৈচিত্র্য। ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ নিরূপণ একটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ বিষয়, যা এই ভূখণ্ডের প্রাচীন ইতিহাস, জনবসতির ধারা এবং বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর সংমিশ্রণের কাহিনি তুলে ধরে। সংবিধান অনুযায়ী এদেশের নাগরিকেরা ‘বাংলাদেশি’ এবং বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী হিসেবে ‘বাঙালি’ নামে পরিচিত। তবে এই পরিচিতি কেবল একটি জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এখানে শত শত বছর ধরে বিভিন্ন মানবগোষ্ঠীর আগমন, মিশ্রণ ও সহাবস্থান ঘটেছে। এই লেখায়, আমরা এই মিশ্র ও বৈচিত্র্যময় ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ বিস্তারিতভাবে আলোচনা করব, যা এই জাতিসত্তার মূল ভিত্তি অনুসন্ধান করবে।
বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ের:
নৃতত্ত্ব (Anthropology) হলো মানব সমাজের উৎপত্তি, বিকাশ, আচার-আচরণ ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য নিয়ে অধ্যয়নকারী বিজ্ঞান। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় নির্ণয় করতে হলে এর ভৌগোলিক অবস্থান এবং সুদীর্ঘকালের অভিবাসন ও সংমিশ্রণের ইতিহাস পর্যালোচনা করা অপরিহার্য। প্রাচীনকাল থেকেই বাংলাদেশ ছিল বিভিন্ন মানবধারার মিলনকেন্দ্র।
১. আদি-অস্ট্রালয়েড (Proto-Australoid) বা ভেড্ডিড গোষ্ঠী:
ধারণা করা হয়, আদি-অস্ট্রালয়েড গোষ্ঠীই ছিল এই অঞ্চলের আদিমতম বাসিন্দা। এদের শারীরিক গঠনে অস্ট্রিক বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সাঁওতাল, শবর, মুন্ডা, এবং অন্যান্য আদিবাসী জনগোষ্ঠীর মধ্যে আজও এদের প্রভাব বিদ্যমান। বাঙালি জাতির মূল গঠনে এদের ভূমিকা অনস্বীকার্য।
২. দ্রাবিড় গোষ্ঠী (Dravidian Group):
ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল থেকে আসা দ্রাবিড়ভাষী জনগোষ্ঠী এই অঞ্চলে প্রবেশ করে। এই জনগােষ্ঠীর প্রভাব মূলত দক্ষিণ ভারতে বেশি দেখা গেলেও, প্রাচীন বাংলার জনজীবনেও এদের উল্লেখযোগ্য মিশ্রণ ঘটে। এদের শারীরিক গড়ন ছিল মাঝারি, মাথা লম্বা এবং নাক অপেক্ষাকৃত ছোট।
৩. মঙ্গোলীয় গোষ্ঠী (Mongoloid Group):
তিব্বত-বর্মী ভাষাভাষী এই জনগােষ্ঠী সাধারণত পূর্ব ও উত্তর-পূর্ব দিক থেকে বাংলায় প্রবেশ করে। এদের মধ্যে চাকমা, মারমা, ত্রিপুরা, গারো, মণিপুরি, কোচ-রাজবংশী ইত্যাদি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলি প্রধান। এদের শারীরিক বৈশিষ্ট্য হলো চাপা নাক, ছোট চোখ, কম লোমযুক্ত দেহ এবং কিছুটা হলুদ বা মিশ্র বাদামী গায়ের রং। এই গোষ্ঠীর প্রভাব পার্বত্য চট্টগ্রাম ও উত্তরবঙ্গের কিছু অংশে বেশি পরিলক্ষিত হয়।
৪. আর্য বা নর্ডিক গোষ্ঠী (Aryan or Nordic Group):
খ্রিস্টপূর্ব সময়ে মধ্য এশিয়া থেকে ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাভাষী আর্যদের আগমন ঘটে। যদিও সরাসরি আর্যরা খুব বেশি সংখ্যায় এই অঞ্চলে স্থায়ী বসতি স্থাপন করেনি, তবে আলপাইন বা আলপীয় (Alpinoid) শাখায় আসা আর্যভাষী গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে পূর্বের আদিবাসী ও দ্রাবিড় জনগোষ্ঠীর সংমিশ্রণ ঘটে। আর্যদের ভাষা ও সংস্কৃতি এই অঞ্চলের মূল বাঙালি সংস্কৃতি গঠনে ব্যাপক প্রভাব ফেলে।
ফলস্বরূপ, আজকের বাঙালি জাতিসত্তা একটি সংকর জাতি বা মিশ্র জাতি (Mixed Race) হিসেবে পরিচিত। প্রাচীনকালে এই ভূখণ্ডে বসবাসকারী চারটি প্রধান নরগোষ্ঠীর—অস্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, মঙ্গোলয়েড ও আর্য—রক্ত ও সংস্কৃতির সংমিশ্রণেই ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ পূর্ণতা লাভ করেছে। এই মিশ্রণ হাজার বছরের পথ পরিক্রমায় এই জাতিকে স্বতন্ত্র ও সহনশীল পরিচিতি দিয়েছে।
বৃহৎ নৃ-গোষ্ঠী: বাঙালি জাতি
বাংলাদেশের জনসংখ্যার প্রায় ৯৮ শতাংশ হলো বাঙালি জাতিগোষ্ঠী। বাঙালির ‘নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ এই মিশ্রণ প্রক্রিয়ারই ফল। ভাষাগত দিক থেকে বাঙালিরা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষাগোষ্ঠীর অন্তর্গত।
বাঙালি জাতির নৃ-তাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যের দিকসমূহ:
- সংকর জাতি: বাঙালিরা কোনো একক বিশুদ্ধ নরগোষ্ঠীর নয়, বরং উপরে উল্লেখিত চারটি প্রধান ধারার সংমিশ্রণে গঠিত।
- ভাষা: বাংলা ভাষা, যা ইন্দো-আর্য শাখা থেকে উদ্ভূত।
- শারীরিক বৈশিষ্ট্য: এদের মধ্যে লম্বা ও চওড়া মাথার গড়ন, বাদামি থেকে ফর্সা গায়ের রং এবং মধ্যমাকৃতির উচ্চতা লক্ষণীয়। তবে, মিশ্রণের কারণে অঞ্চলভেদে শারীরিক বৈচিত্র্য দেখা যায় (যেমন, পূর্বাঞ্চলে মঙ্গোলীয় প্রভাব)।
- উপভাষা ও আঞ্চলিক সংস্কৃতি: ঢাকাইয়া, সিলেটি, চাঁটগাইয়া, নোয়াখালিয়া, বরিশালিয়া, রংপুরি ইত্যাদি আঞ্চলিক উপভাষা ও সাংস্কৃতিক উপবিভাগ বাঙালি জাতিগোষ্ঠীর অভ্যন্তরীণ বৈচিত্র্যকে তুলে ধরে।
বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ের মূল নির্ণায়ক: ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীসমূহ
বাঙালিদের পাশাপাশি, প্রায় ৫০টিরও বেশি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এদেশের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়কে আরও বৈচিত্র্যময় করেছে। এই গোষ্ঠীগুলি প্রধানত পার্বত্য চট্টগ্রাম, বৃহত্তর সিলেট, ময়মনসিংহ ও উত্তরবঙ্গের সমতলে বসবাস করে। এদেরকে ‘ক্ষুদ্র জাতিসত্তা’ বা ‘নৃ-গোষ্ঠী’ হিসেবে অভিহিত করা হয়। ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী, দেশে ২৭টি ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর তালিকা থাকলেও বর্তমানে এই সংখ্যা প্রায় ৫৭টির মতো। এদের বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে বিবেচনা করা হয়।
প্রধান ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং তাদের নৃ-তাত্ত্বিক অবস্থান:
| নৃগোষ্ঠী | প্রধান অবস্থান | নৃ-তাত্ত্বিক সম্পর্ক | উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য |
| চাকমা | পার্বত্য চট্টগ্রাম (রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি) | মঙ্গোলীয় (তিব্বত-বর্মী) | বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, জুম চাষে অভ্যস্ত, মাতৃতান্ত্রিক প্রভাব ছিল। বাংলাদেশের বৃহত্তম ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী। |
| মারমা | পার্বত্য চট্টগ্রাম (বান্দরবান, রাঙ্গামাটি, খাগড়াছড়ি) | মঙ্গোলীয় (আরাকানিজ উপশাখা) | বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, ম্রো বা মগ নামেও পরিচিত। |
| ত্রিপুরা | পার্বত্য চট্টগ্রাম, কুমিল্লা, সিলেট | মঙ্গোলীয় (তিব্বত-বর্মী) | ককবরক ভাষাভাষী, বিভিন্ন দলে বিভক্ত (যেমন, উচোই, ডেফার, ফিন্ডা)। |
| সাঁওতাল | রাজশাহী, রংপুর (উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল) | আদি-অস্ট্রালয়েড | সাঁওতালি ভাষা (অস্ট্রো-এশীয়), প্রকৃতি পূজায় বিশ্বাসী, কঠোর পরিশ্রমী। |
| গারো | বৃহত্তর ময়মনসিংহ (ময়মনসিংহ, নেত্রকোনা, শেরপুর) | মঙ্গোলীয় (তিব্বত-বর্মী) | মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথা, প্রধান উৎসব ‘ওয়ানগালা’, খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর সংখ্যাধিক্য। |
| মণিপুরি | বৃহত্তর সিলেট (মৌলভীবাজার, সিলেট) | মঙ্গোলীয় | বৈষ্ণব হিন্দু ধর্মাবলম্বী, তাঁত শিল্পে দক্ষ, ‘মণিপুরি নৃত্য’ বিশ্বখ্যাত। |
| খাসিয়া | বৃহত্তর সিলেট (সিলেট, মৌলভীবাজার) | মঙ্গোলীয় (মন-খেমার শাখা) | মাতৃতান্ত্রিক পরিবার, পান চাষে দক্ষ। |
| রাখাইন | পটুয়াখালী, কক্সবাজার | মঙ্গোলীয় (বার্মিজ শাখা) | বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী, উপকূলীয় অঞ্চলে বসবাস। |
এই ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলো তাদের স্বতন্ত্র ভাষা, ধর্মীয় বিশ্বাস, সামাজিক রীতিনীতি, উৎসব ও পোশাকের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’কে এক নতুন মাত্রা দিয়েছে। তারা এদেশের হাজার বছরের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ের নির্ণায়ক উপাদানসমূহ
নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় কেবল রক্ত বা বংশগতির ওপর নির্ভর করে না, বরং সংস্কৃতি, ভাষা, ধর্ম এবং জীবনযাত্রার পদ্ধতিও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ এই উপাদানগুলোর সমন্বয়ে গঠিত:
১. ভাষা (Language):
বাংলা ভাষা এখানে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতার অধিকারী হলেও, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে তিব্বত-বর্মী (চাকমা, মারমা, গারো, ত্রিপুরা), অস্ট্রো-এশীয় (সাঁওতালি), এবং দ্রাবিড় (ওঁরাওদের কুরুখ) ভাষাগুলোর প্রচলন রয়েছে।
২. ধর্ম (Religion):
ইসলাম ধর্ম (সংখ্যাগরিষ্ঠ), হিন্দু ধর্ম (দ্বিতীয় বৃহত্তম), বৌদ্ধ ধর্ম (পার্বত্য চট্টগ্রামে প্রধান), এবং খ্রিস্ট ধর্ম ও বিভিন্ন প্রকৃতির উপাসনা (ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মধ্যে) এই জাতিগোষ্ঠীর ধর্মীয় বৈচিত্র্যকে প্রকাশ করে।
৩. জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতি (Lifestyle and Culture):
সমতলের বাঙালিরা কৃষিভিত্তিক জীবনযাপন ও মিশ্র সংস্কৃতি অনুসরণ করে, যেখানে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে জুম চাষ (পার্বত্য), মাতৃতান্ত্রিক সমাজ (গারো, খাসিয়া), বা ভিন্ন ধরনের পোশাক ও উৎসব (যেমন, মারমাদের সাংগ্রাই, গারোদের ওয়ানগালা, সাঁওতালদের সহরায়) দেখা যায়।
৪. জনপদভিত্তিক উপবিভাগ:
বাঙালিদের মধ্যে ঢাকাইয়া, সিলেটি, চাঁটগাইয়া, বরিশালিয়া ইত্যাদি আঞ্চলিক উপবিভাগ তাদের স্বতন্ত্র সাংস্কৃতিক ধারাকে চিহ্নিত করে। এই আঞ্চলিক বৈশিষ্ট্যগুলিও ‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’এর অংশ।
বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়:
‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ বিশ্লেষণ করলে নিম্নলিখিত গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলি উঠে আসে:
১. সংকর জাতিসত্তা: বাঙালিরা আদি-অস্ট্রাল, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় ও আর্য নরগোষ্ঠীর মিশ্রণজাত।
২. আঞ্চলিক বৈচিত্র্য: বাংলাদেশের জনগণের মাঝে অঞ্চলভেদে নৃ-তাত্ত্বিক ও সাংস্কৃতিক ভিন্নতা বিদ্যমান।
৩. মাতৃতান্ত্রিক সমাজ: গারো ও খাসিয়াদের মতো কিছু ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর মাঝে মাতৃতান্ত্রিক পরিবার প্রথা প্রচলিত।
৪. ভাষা বৈচিত্র্য: বাংলা ভাষার পাশাপাশি তিব্বত-বর্মী, অস্ট্রো-এশীয় এবং দ্রাবিড় গোষ্ঠীর ভাষা প্রচলিত।
৫. জুম চাষ: পার্বত্য অঞ্চলের চাকমা, মারমা ও ত্রিপুরাদের জীবনযাত্রায় জুম চাষের প্রভাব লক্ষ্যণীয়।
৬. ধর্মীয় সহাবস্থান: ইসলাম, হিন্দু, বৌদ্ধ ও খ্রিস্ট ধর্মসহ বিভিন্ন প্রকৃতির উপাসনা এই নৃ-তাত্ত্বিক গোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়।
৭. বৃহৎ জাতিগোষ্ঠী: বাঙালি জাতি দেশের প্রধান ও বৃহত্তম নৃ-গোষ্ঠী।
৮. ক্ষুদ্র জাতিসত্তার উপস্থিতি: প্রায় ৫৭টির মতো ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী দেশের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়কে সমৃদ্ধ করেছে।
৯. ঐতিহাসিক অভিবাসন: বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন দিক থেকে মানবগোষ্ঠীর আগমনের ফলে এই সংমিশ্রণ ঘটেছে।
১০. আর্ট ও কারুশিল্প: মণিপুরীদের তাঁত শিল্প, চাকমাদের পোশাক এবং সাঁওতালদের লোকশিল্প তাদের স্বতন্ত্র নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয় বহন করে।
১১. ফেনোটাইপিক বৈচিত্র্য: গায়ের রং, চুলের ধরন ও মুখাবয়বের দিক থেকে উত্তর-পূর্বাঞ্চলে মঙ্গোলীয় প্রভাব বেশি পরিলক্ষিত হয়।
১২. আঞ্চলিক উপভাষা: বাঙালির আঞ্চলিক উপভাষাগুলি সাংস্কৃতিক ও সামাজিক পরিচয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
১৩. উৎসবের ভিন্নতা: প্রতিটি নৃগোষ্ঠীর নিজস্ব ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসব (যেমন- বিজু, সাংগ্রাই, ওয়ানগালা, সহরায়) রয়েছে।
১৪. সংবিধানিক পরিচিতি: জাতি হিসেবে বাঙালি ও নাগরিক হিসেবে বাংলাদেশি—এই দুই পরিচিতি বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়এর আধুনিক রূপ।
১৫. ঐতিহ্য ও প্রত্নতত্ত্ব: প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনসমূহ আদি-অস্ট্রালয়েড ও দ্রাবিড় গোষ্ঠীর প্রাচীন বসতির প্রমাণ দেয়।
উপসংহার
‘বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়’ একক বা সরল নয়, বরং বহুধা বিভক্ত ও মিশ্র। প্রাচীন মানবধারা থেকে শুরু করে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর আগমন ও সংমিশ্রণের ফল আজকের বাঙালি ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর সমন্বয়ে গঠিত এই জাতিসত্তা। বাঙালিরা মূলত একটি মিশ্র জাতি, যার রক্তে রয়েছে অস্ট্রালয়েড, দ্রাবিড়, মঙ্গোলীয় ও আর্যদের উত্তরাধিকার। এই মিশ্রণ বাংলাদেশের জনগণের নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়এর মূল ভিত্তি, যা এই জাতিকে একটি শক্তিশালী, বৈচিত্র্যময় এবং ঐতিহ্যবাহী জাতিতে পরিণত করেছে। এই বৈচিত্র্যই বাংলাদেশের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যের প্রাণ। এই অনন্য নৃ-তাত্ত্বিক পরিচয়ই বিশ্ব মানচিত্রে বাংলাদেশকে একটি স্বতন্ত্র ও বিশেষ অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত করেছে। তাদের ইতিহাস, সংস্কৃতি, ভাষা ও জীবনযাত্রার পার্থক্য থাকা সত্ত্বেও, ‘বাংলাদেশি’ জাতীয় পরিচয়ে তারা সকলেই এক ও অভিন্ন।

