বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান আলোচনা কর।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান আলোচনা কর। ভূমিকা: ১৯৭১ সালে যখন…
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান আলোচনা কর।
ভূমিকা:
১৯৭১ সালে যখন পূর্ব পাকিস্তানে (বর্তমান বাংলাদেশ) পাকিস্তান সামরিক বাহিনী কর্তৃক ‘অপারেশন সার্চলাইট’-এর নামে মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা শুরু হয়, তখন বিশ্বের বৃহত্তম আন্তর্জাতিক সংস্থা জাতিসংঘ একটি কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হয়। একদিকে ছিল মানবিক বিপর্যয় ও মানবাধিকার লঙ্ঘন, অন্যদিকে ছিল পরাশক্তিগুলোর মধ্যকার ভূ-রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব। এই জটিল পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান সরাসরি সামরিক বা রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের চেয়ে মূলত মানবিক সহায়তা, বিশ্ব জনমত সৃষ্টি এবং যুদ্ধোত্তর পুনর্বাসনকে কেন্দ্র করে আবর্তিত হয়। জাতিসংঘের সনদের মূল নীতিগুলো লঙ্ঘিত হওয়া সত্ত্বেও, আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক চাপ ও মানবিক সাড়ার ক্ষেত্রে সংস্থাটির ভূমিকা ছিল অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান এর মূল্যায়ন করতে গেলে এই দ্বিমুখী চিত্রটি মনে রাখা জরুরি।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান:
১. মানবিক ত্রাণ তৎপরতা (Humanitarian Relief Operations): মার্চ মাসের পর থেকে ভারতে প্রায় ১ কোটি শরণার্থীর আগমন ঘটলে, এটি এক বিশাল মানবিক সংকটে রূপ নেয়। জাতিসংঘ শরণার্থী বিষয়ক হাইকমিশনার (UNHCR) এবং অন্যান্য সহযোগী সংস্থা যেমন UNICEF, WHO, WFP-এর মাধ্যমে ভারতে আশ্রয় নেওয়া শরণার্থীদের জন্য খাদ্য, আশ্রয়, চিকিৎসা ও অন্যান্য মৌলিক সুবিধা প্রদানে নেতৃত্ব দেয়। এটি ছিল বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান এর সবচেয়ে দৃশ্যমান অংশ।
২. পূর্ব পাকিস্তান ত্রাণ কার্যক্রম (UNEPRO – United Nations East Pakistan Relief Operation): ১৯৭১ সালের ১৭ জুলাই জাতিসংঘ পূর্ব পাকিস্তানে আটকে পড়া জনগোষ্ঠীর জন্য ‘জাতিসংঘ পূর্ব পাকিস্তান ত্রাণ কার্যক্রম’ (UNEPRO) প্রতিষ্ঠা করে। যদিও পাকিস্তান সরকার প্রথমে এটি বেসামরিক প্রশাসনের মাধ্যমে পরিচালনার চেষ্টা করে, তবে নভেম্বর মাস থেকে জাতিসংঘ সরাসরি এই কার্যক্রমের নিয়ন্ত্রণ নেয়, যার লক্ষ্য ছিল অভ্যন্তরীণভাবে ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তা প্রদান।
৩. আন্তর্জাতিক দৃষ্টি আকর্ষণ ও জনমত সৃষ্টি: পাকিস্তানি বাহিনীর গণহত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনাকে বিশ্ব দরবারে তুলে ধরার ক্ষেত্রে জাতিসংঘের প্ল্যাটফর্ম গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। যদিও সরাসরি কোনো প্রস্তাব পাশ হয়নি, তবুও সাধারণ পরিষদ ও নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনাগুলো বিশ্বব্যাপী গণমাধ্যম ও সরকারগুলোর দৃষ্টি আকর্ষণ করে।
৪. নিরাপত্তা পরিষদের আলোচনা (Security Council Debates): বিশেষত ভারত-পাকিস্তান যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর, ডিসেম্বরে জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদে একাধিক বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। যদিও যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের পাকিস্তানের পক্ষ নেওয়া এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটোর কারণে যুদ্ধবিরতি সংক্রান্ত কোনো কার্যকর প্রস্তাবে ঐকমত্য পৌঁছানো সম্ভব হয়নি, এই আলোচনাগুলো আন্তর্জাতিক বিতর্কের কেন্দ্রে পরিণত হয়।
৫. সোভিয়েত ইউনিয়নের ভেটো (USSR’s Veto): মুক্তিযুদ্ধের শেষদিকে, যখন পাকিস্তান ও তার মিত্ররা যুদ্ধবিরতি ও সামরিক প্রত্যাহারের প্রস্তাব তোলে, তখন সোভিয়েত ইউনিয়ন (বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ মিত্র) একাধিকবার ভেটো প্রদান করে। এই ভেটো সামরিক বিজয় অর্জনে বাংলাদেশের পক্ষে পরোক্ষভাবে সুবিধা এনে দেয়। এটি বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান এর এক কৌশলগত দিক।
৬. সাধারণ পরিষদে যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব (General Assembly Resolution): ডিসেম্বর ৭ তারিখে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে ‘শান্তির জন্য ঐক্যের সূত্র’ শীর্ষক একটি যুদ্ধবিরতি প্রস্তাব গৃহীত হয়। যদিও ভারত ও বাংলাদেশ এই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে, এটি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি অংশের মনোভাব প্রকাশ করেছিল।
৭. যুদ্ধবন্দী ও আটক বাঙালি প্রত্যাবাসনে ভূমিকা: স্বাধীনতার পর, জাতিসংঘ এবং আন্তর্জাতিক রেড ক্রস কমিটি (ICRC) পাকিস্তানের বিভিন্ন স্থানে আটকে পড়া বাঙালি এবং বাংলাদেশে থাকা পাকিস্তানি যুদ্ধবন্দীদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
৮. যুদ্ধোত্তর পুনর্গঠন ও পুনর্বাসন (Post-War Reconstruction): স্বাধীনতার পরপরই জাতিসংঘ ‘জাতিসংঘ বাংলাদেশ ত্রাণ কার্যক্রম’ (UNROB – United Nations Relief Operations in Bangladesh) প্রতিষ্ঠা করে। এই সংস্থাটি যুদ্ধ-বিধ্বস্ত রাস্তাঘাট, সেতু, বন্দর (যেমন চালনা/মংলা পোর্ট) এবং অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পুনর্গঠনে সহায়তা করে।
৯. মানবাধিকার পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ: যুদ্ধকালীন সময়ে জাতিসংঘ এবং এর সহযোগী সংস্থাগুলো (যেমন মানবাধিকার কমিশন) পূর্ব পাকিস্তানের মানবাধিকার পরিস্থিতি গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং আন্তর্জাতিক প্রতিবেদনগুলোতে এর উল্লেখ করে।
১০. আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি আদায়ে সহায়তা: যদিও চীন ১৯৭২ ও ১৯৭৩ সালে বাংলাদেশের সদস্যপদ লাভের ক্ষেত্রে ভেটো দেয়, তবুও জাতিসংঘের অভ্যন্তরে অন্যান্য সদস্য রাষ্ট্রের সমর্থন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান এর অংশ হিসেবে নতুন রাষ্ট্রটির আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি দ্রুত করতে সাহায্য করে।
১১. কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি: জাতিসংঘের মহাসচিব উ থান্ট (U Thant) এবং পরবর্তীতে কুর্ট ওয়াল্ডহেইম (Kurt Waldheim) ব্যক্তিগতভাবে ভারত ও পাকিস্তানের উপর কূটনৈতিক চাপ সৃষ্টি করেন যাতে তারা সংঘাত এড়িয়ে শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথে হাঁটে।
১২. আন্তর্জাতিক আইনের প্রতি গুরুত্বারোপ: জাতিসংঘ প্ল্যাটফর্মে বারবার যুদ্ধাপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে আলোচনা হওয়ায়, এটি আন্তর্জাতিক আইন ও মানবাধিকারের গুরুত্বের প্রতি বিশ্বকে দৃষ্টি দিতে বাধ্য করে।
১৩. বাংলাদেশের প্রতিনিধিত্বের প্রচেষ্টা: মুক্তিযুদ্ধ চলাকালীন প্রবাসী বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘে বিভিন্ন পর্যায়ে কূটনৈতিক প্রতিনিধি পাঠিয়ে তাদের বক্তব্য তুলে ধরার চেষ্টা করে, যা বিশ্ব দরবারে বাংলাদেশের ন্যায্য দাবির পক্ষে সমর্থন সৃষ্টিতে সহায়ক হয়।
১৪. স্বাস্থ্য ও স্যানিটেশন সহায়তা: শরণার্থী শিবির ও যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে মহামারি রোধ ও জনস্বাস্থ্য নিশ্চিত করতে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (WHO) এবং ইউনিসেফ (UNICEF) জরুরি স্বাস্থ্যসেবা ও স্যানিটেশন সামগ্রী সরবরাহ করে।
১৫. দীর্ঘমেয়াদী উন্নয়ন সম্পর্ক স্থাপন: মুক্তিযুদ্ধ পরবর্তী UNROB কার্যক্রমের সমাপ্তির পর, জাতিসংঘের বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থা বাংলাদেশে তাদের দীর্ঘমেয়াদী কার্যক্রম শুরু করে, যা সদ্য স্বাধীন রাষ্ট্রের অর্থনৈতিক ও সামাজিক উন্নয়নে ভিত্তি স্থাপন করে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান ছিল প্রতিকূল ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতির মধ্যে সীমিত হলেও অপরিহার্য। যদিও জাতিসংঘের নিরাপত্তা পরিষদ তার প্রধান উদ্দেশ্য—সরাসরি সংঘাত বন্ধ করা—তাতে ব্যর্থ হয়েছিল (প্রধানত পরাশক্তিগুলোর শীতল যুদ্ধের কারণে), তবুও সংস্থাটি এক কোটি শরণার্থীর জীবন রক্ষায় এবং যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশের পুনর্গঠনে যে মানবিক ও কৌশলগত সহায়তা দিয়েছিল, তা অনস্বীকার্য। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান ছিল মূলত আন্তর্জাতিক নৈতিক বিবেক এবং বিশ্বব্যাপী মানবিক দায়িত্বের প্রতি একটি অঙ্গীকার। স্বাধীনতা লাভের পর বাংলাদেশ দ্রুত জাতিসংঘের সদস্যপদ (১৯৭৪) লাভ করে, যা প্রমাণ করে যে, এই প্রতিষ্ঠানটি নতুন রাষ্ট্রের সার্বভৌমত্ব এবং আন্তর্জাতিক শান্তি রক্ষায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে চলেছে। ১৯৭১ সালের কঠিন প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে জাতিসংঘের অবদান ছিল ইতিহাসের এক জটিল অধ্যায়, যেখানে এর সফলতা মাপা হয় সরাসরি যুদ্ধ থামানোর বদলে লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবন বাঁচানোর মাধ্যমে।


