বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের কারণ সমূহ উল্লেখ কর।
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের কারণ সমূহ বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ…

বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনের কারণ সমূহ
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামো ঐতিহ্যগতভাবে একটি জটিল ও বহুমাত্রিক সামাজিক ব্যবস্থা। গত কয়েক দশকে এই কাঠামোতে ব্যাপক পরিবর্তন এসেছে। এই পরিবর্তনের পিছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে, যা নিম্নে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:
শিক্ষার প্রসার ও সচেতনতা বৃদ্ধি:
গ্রামীণ সমাজে শিক্ষার প্রসার একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনের কারণ। সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে প্রাথমিক শিক্ষার বাধ্যতামূলক করা, মাধ্যমিক পর্যন্ত বিনামূল্যে শিক্ষা প্রদান, শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা বৃদ্ধি ইত্যাদি কারণে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর মধ্যে শিক্ষার হার বেড়েছে। এর ফলে কুসংস্কার, অন্ধবিশ্বাস ক্রমশ কমে আসছে এবং আধুনিক চিন্তাধারার প্রসার ঘটছে।
যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়ন:
দেশের সর্বত্র সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি হওয়ায় গ্রাম ও শহরের মধ্যে দূরত্ব কমেছে। ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী সহজেই শহরাঞ্চলে যাতায়াত করতে পারছে, নতুন জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা অর্জন করছে। এছাড়া মোবাইল ফোন, ইন্টারনেট ইত্যাদি যোগাযোগ মাধ্যমের ব্যাপক প্রসারের ফলে তথ্য-প্রযুক্তির সুবিধা গ্রামে পৌঁছে গেছে।
অর্থনৈতিক কার্যক্রমের বিস্তার:
গ্রামীণ অর্থনীতিতে কৃষির পাশাপাশি অকৃষি খাতের প্রসার ঘটেছে। ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প, ব্যবসা-বাণিজ্য, সেবামূলক কার্যক্রম বৃদ্ধি পেয়েছে। মাইক্রোক্রেডিট প্রোগ্রামের মাধ্যমে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী, বিশেষ করে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। এর ফলে সামাজিক মর্যাদা ও ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে পরিবর্তন আসছে।
নারী শিক্ষা ও ক্ষমতায়ন:
গ্রামীণ সমাজে নারী শিক্ষার হার বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি বিভিন্ন প্রকল্প যেমন – উপবৃত্তি প্রদান, বিনামূল্যে বই বিতরণ ইত্যাদির ফলে মেয়েদের স্কুলে যাওয়ার হার বেড়েছে। এছাড়া বিভিন্ন এনজিও’র কার্যক্রম, আয়বর্ধক প্রকল্প ইত্যাদির মাধ্যমে নারীরা আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হচ্ছে। ফলে পারিবারিক ও সামাজিক সিদ্ধান্ত গ্রহণে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ছে।
পরিবার কাঠামোর পরিবর্তন:
ঐতিহ্যগত যৌথ পরিবার ব্যবস্থা ভেঙে ক্রমশ একক পরিবার গড়ে উঠছে। শিক্ষা, কর্মসংস্থান ইত্যাদির জন্য গ্রাম থেকে শহরে পাড়ি জমানোর প্রবণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলে পারিবারিক বন্ধন, মূল্যবোধ ও সামাজিক নিয়ন্ত্রণে পরিবর্তন আসছে।
জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও স্বাস্থ্যসেবা:
পরিবার পরিকল্পনা কার্যক্রমের ফলে জন্মহার কমেছে। স্বাস্থ্যসেবার মান ও প্রাপ্যতা বৃদ্ধি পেয়েছে। ফলে শিশু ও মাতৃমৃত্যুর হার কমেছে, গড় আয়ু বেড়েছে। এর ফলে জনসংখ্যার গঠন ও কাঠামোতে পরিবর্তন এসেছে।
কৃষি ব্যবস্থার আধুনিকায়ন:
কৃষিতে আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, যান্ত্রিকীকরণ, উচ্চফলনশীল বীজের ব্যবহার ইত্যাদির ফলে উৎপাদন বেড়েছে। কৃষক শ্রমিকের প্রয়োজন কমেছে। ফলে গ্রামীণ শ্রম বাজারে পরিবর্তন এসেছে এবং পেশাগত বৈচিত্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে।
গণমাধ্যমের প্রভাব:
টেলিভিশন, রেডিও, সংবাদপত্র ইত্যাদি গণমাধ্যমের প্রসারের ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠী বিশ্বের সাথে যুক্ত হচ্ছে। নতুন তথ্য, জ্ঞান ও মূল্যবোধের সাথে পরিচিত হচ্ছে। ফলে চিন্তাধারা ও জীবনযাত্রার মানে পরিবর্তন আসছে।
বহির্বিশ্বের প্রভাব:
বৈদেশিক কর্মসংস্থান, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিশ্বায়ন ইত্যাদির ফলে গ্রামীণ সমাজে বহির্বিশ্বের প্রভাব পড়ছে। বিদেশ ফেরত কর্মীদের মাধ্যমে নতুন সংস্কৃতি ও জীবনধারার প্রভাব পড়ছে।
রাজনৈতিক সচেতনতা:
গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রসার, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার শক্তিশালীকরণ, রাজনৈতিক দলগুলোর কার্যক্রম ইত্যাদির ফলে গ্রামীণ জনগোষ্ঠীর রাজনৈতিক সচেতনতা বেড়েছে। ফলে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তাদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি পেয়েছে।
সামাজিক আন্দোলন ও সংগঠন:
বিভিন্ন সামাজিক আন্দোলন যেমন – নারী অধিকার, শিশু অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদির প্রভাবে গ্রামীণ সমাজে নতুন মূল্যবোধ ও চেতনার বিকাশ ঘটছে। এছাড়া বিভিন্ন সমিতি, সংগঠন ইত্যাদির মাধ্যমে সামাজিক কর্মকাণ্ড বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপসংহার:
বাংলাদেশের গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর পরিবর্তন একটি চলমান প্রক্রিয়া। শিক্ষা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, যোগাযোগ ইত্যাদি বিভিন্ন ক্ষেত্রে উন্নয়নের ফলে এই পরিবর্তন আরও ত্বরান্বিত হচ্ছে। তবে এই পরিবর্তনের পাশাপাশি গ্রামীণ সমাজের ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ সংরক্ষণের বিষয়টিও গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একটি সুস্থ ও সুষম সমাজ গঠনে উভয়ই প্রয়োজন। সুতরাং গ্রামীণ সমাজ কাঠামোর পরিবর্তনকে ইতিবাচকভাবে নিয়ে যাওয়ার জন্য সরকারি-বেসরকারি সকল পক্ষের সমন্বিত প্রচেষ্টা প্রয়োজন।
আধুনিকীকরণের প্রভাব:
গ্রামীণ সমাজে আধুনিকীকরণের প্রভাব ক্রমশ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আধুনিক প্রযুক্তি, যন্ত্রপাতি, জীবনযাত্রার মান ইত্যাদির পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ জীবনধারায় নতুন মাত্রা যুক্ত হচ্ছে। তবে এর ফলে কিছু ঐতিহ্যগত মূল্যবোধ ও সংস্কৃতি হারিয়ে যাচ্ছে।
এই সকল পরিবর্তনের ফলে গ্রামীণ সমাজ কাঠামোতে যে প্রভাব পড়েছে তা নিম্নরূপ:
১. সামাজিক সম্পর্কের পরিবর্তন
২. মূল্যবোধ ও আদর্শের পরিবর্তন
৩. সামাজিক স্তরবিন্যাসে পরিবর্তন
৪. নেতৃত্ব কাঠামোর পরিবর্তন
৫. সামাজিক নিয়ন্ত্রণের ধরনে পরিবর্তন
এসব পরিবর্তন একদিকে যেমন গ্রামীণ সমাজকে আধুনিকতার দিকে এগিয়ে নিচ্ছে, অন্যদিকে তেমনি কিছু চ্যালেঞ্জও সৃষ্টি করছে। এই চ্যালেঞ্জগুলো মোকাবেলা করে সুষম উন্নয়ন নিশ্চিত করাই বর্তমান সময়ের দাবি।