১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি ও ফলাফল পর্যালোচনা কর।

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি ও ফলাফল…

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি ও ফলাফল পর্যালোচনা কর।


১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি ও ফলাফল পর্যালোচনা কর

ভূমিকা

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দ ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ মোড়, যখন ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মোগল সম্রাট শাহ আলম (দ্বিতীয়)-এর নিকট থেকে বাংলার দেওয়ানি লাভ করে। এটি শুধু একটি প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্যের সূচনাবিন্দু। “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” উপনিবেশবাদের প্রাথমিক ধাপ এবং ভারতের অর্থনৈতিক শোষণের মূল ভিত্তি তৈরি করে। এ নিবন্ধে আমরা ১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের পটভূমি, কারণ এবং এর দীর্ঘমেয়াদি ফলাফল পর্যালোচনা করব।


পটভূমি

১. পলাশীর যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি

১৭৫৭ সালের পলাশীর যুদ্ধে সিরাজউদ্দৌলার পরাজয়ের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি বাংলায় রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ শুরু করে। এই যুদ্ধে বিশ্বাসঘাতকতা, বিশেষ করে মীর জাফরের ভূমিকা, কোম্পানির পক্ষে জয় এনে দেয়।

২. বক্সারের যুদ্ধ (১৭৬৪)

১৭৬৪ সালের বক্সারের যুদ্ধে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি মীর কাসিম, মোগল সম্রাট শাহ আলম এবং নবাব শুজাউদ্দৌলার যৌথ শক্তিকে পরাজিত করে। এই বিজয় কোম্পানির সামরিক ও রাজনৈতিক ক্ষমতা বহুগুণ বাড়িয়ে দেয়।

৩. এলাহাবাদ চুক্তি (১৭৬৫)

বক্সারের যুদ্ধের পর ১৭৬৫ সালে এলাহাবাদ চুক্তির মাধ্যমে মোগল সম্রাট শাহ আলম ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানিকে বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার দেওয়ানি বা রাজস্ব আদায়ের অধিকার প্রদান করেন। এভাবেই “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” বাস্তবায়িত হয়।


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের কারণসমূহ

৪. রাজস্ব আহরণের প্রয়োজন

কোম্পানির বাণিজ্যিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য বিপুল অর্থের প্রয়োজন ছিল। “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” তাদেরকে স্থানীয় উৎস থেকে রাজস্ব আহরণে সক্ষম করে।

৫. মোগল সাম্রাজ্যের দুর্বলতা

১৮শ শতকে মোগল সাম্রাজ্য ছিল দুর্বল ও ছিন্নভিন্ন। ফলে ব্রিটিশদের সামনে তেমন কোনো প্রতিরোধ গড়ে ওঠেনি।

৬. ভারতীয় শাসকদের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব

বাংলা, বিহার ও উড়িষ্যার নবাবদের মধ্যে মতভেদ এবং বিশ্বাসঘাতকতা কোম্পানিকে সুবিধাজনক অবস্থানে এনে দেয়।


ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভের ফলাফল

৭. দ্বৈত শাসনব্যবস্থার সূচনা

১৭৬৫-৭২ সাল পর্যন্ত “দ্বৈত শাসন” চালু ছিল, যেখানে নবাব নামমাত্র প্রশাসক ছিলেন, আর প্রকৃত ক্ষমতা ছিল কোম্পানির হাতে।

৮. রাজস্ব ব্যবস্থার পরিবর্তন

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ”-এর মাধ্যমে কোম্পানি রাজস্ব সংগ্রহে সরাসরি নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করে। কর আদায়ের উদ্দেশ্য ছিল কেবল মুনাফা অর্জন, যা কৃষকদের উপর প্রচণ্ড চাপ সৃষ্টি করে।

৯. কৃষি ও অর্থনীতিতে ধ্বস

চাষিরা অতিরিক্ত কর দিতে না পেরে জমি ছেড়ে দেয়। কৃষিজ উৎপাদন হ্রাস পায় এবং বাংলার অর্থনীতি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

১০. ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষ

রাজস্ব নীতির কারণে চাষিরা খাদ্য সংরক্ষণে ব্যর্থ হয়। ১৭৭০ সালের দুর্ভিক্ষে প্রায় ১ কোটি মানুষ মারা যায়। এটি ছিল “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ”-এর একটি ভয়াবহ ফলাফল।

১১. প্রশাসনিক দুর্নীতি ও স্বেচ্ছাচারিতা

কোম্পানির কর্মচারীরা নিজেদের স্বার্থে রাজস্ব আদায়ে দুর্নীতিপূর্ণ আচরণ করে। তারা ‘নবাব’ নামে পরিচিত হলেও ছিল স্বৈরশাসক।

১২. শিল্প ও কুটিরশিল্পের ধ্বংস

ব্রিটিশ কোম্পানি ভারতীয় হস্তশিল্পের বিকাশ রোধ করে ইউরোপ থেকে পণ্য আমদানি বাড়ায়। এর ফলে ভারতের ঐতিহ্যবাহী কুটিরশিল্প প্রায় ধ্বংস হয়ে যায়।


দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব

১৩. ভারতীয় জাতীয়তাবাদের জন্ম

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” জনগণকে ধীরে ধীরে ব্রিটিশ শাসনের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হতে প্রভাবিত করে। এই শোষণই ছিল জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের সূতিকাগার।

১৪. আধুনিক প্রশাসনের ভিত্তি

যদিও এটি শোষণমূলক ছিল, তথাপি কোম্পানির রাজস্ব প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা ও রেলপথ নির্মাণ পরবর্তীকালে আধুনিক ভারতের ভিত্তি স্থাপনে সহায়ক হয়।

১৫. ব্রিটিশ সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার শুরু

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ”-এর মাধ্যমে ব্রিটিশরা একটি উপনিবেশ গঠনের প্রাথমিক পদক্ষেপ নেয়, যা শতাব্দীব্যাপী শাসনের রূপ নেয়।


উপসংহার

১৭৬৫ খ্রিস্টাব্দে “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” ছিল উপমহাদেশে ব্রিটিশ আধিপত্য বিস্তারের সূচনা। এটি শুধু অর্থনৈতিক শোষণের পথ উন্মুক্ত করেনি, বরং ভারতীয় রাজনীতি, প্রশাসন ও সমাজব্যবস্থায় ব্যাপক পরিবর্তন আনে। এর ফলাফল হিসেবে ভারত বহু দশক ধরে ঔপনিবেশিক শাসনের যাতাকলে নিষ্পেষিত হয়েছে। আজ ইতিহাসের দৃষ্টিতে “ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির দেওয়ানি লাভ” একটি গভীরতর শোষণ ও ক্ষমতা গ্রহণের অধ্যায় হিসেবে মূল্যায়িত হয়।

Degree suggestion Facebook group

২য় বর্ষ ডিগ্রি পরিক্ষার সকল বিষয়ের সাজেশন ও এর উত্তর


নির্ভরযোগ্য সূত্র:

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *