মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা আলোচনা কর
মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা টমাস…

মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা
টমাস হবস (Thomas Hobbes) ছিলেন ১৭তম শতাব্দীর একজন প্রভাবশালী ইংরেজ দার্শনিক, যিনি মূলত তার রাজনৈতিক তত্ত্ব এবং “লেভায়াথান” (Leviathan) গ্রন্থের জন্য প্রসিদ্ধ। মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা সমাজবিজ্ঞান এবং রাষ্ট্রবিজ্ঞানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। হবস বিশ্বাস করতেন যে মানব প্রকৃতি এবং প্রকৃতির রাজ্যের মধ্যকার সম্পর্কই সমাজ এবং রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়াকে নির্দেশ করে।
Degree 1st year short suggestion 2025 pdf
Degree suggestion Facebook group
১. মানব প্রকৃতির মূল বৈশিষ্ট্য
টমাস হবসের মতে, মানব প্রকৃতির মূল বৈশিষ্ট্য হলো আত্মকেন্দ্রিকতা। মানুষ স্বাভাবিকভাবে নিজের স্বার্থের প্রতি মনোযোগী এবং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই তাদের প্রাথমিক লক্ষ্য।
২. মানুষের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষা
হবস বিশ্বাস করতেন যে মানুষ সর্বদা তাদের নিজের ইচ্ছা এবং আকাঙ্ক্ষা পূরণের জন্য সচেষ্ট থাকে। এই ইচ্ছাগুলোই তাদের কার্যকলাপের মূল চালিকা শক্তি।
৩. প্রকৃতির রাজ্যের সংজ্ঞা
হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্য হলো এমন একটি অবস্থা যেখানে কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শাসন বা আইন নেই। এটি একটি অরাজক এবং অপরিচ্ছন্ন অবস্থা, যেখানে মানুষের মধ্যে সর্বদা সংঘাত এবং প্রতিযোগিতা বিদ্যমান।
৪. “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ”
প্রকৃতির রাজ্যের মূল ধারণা হলো “সবার বিরুদ্ধে সবার যুদ্ধ” (Bellum omnium contra omnes)। এই অবস্থায় মানুষ নিজের স্বার্থে অন্যদের ক্ষতি করতেও পিছপা হয় না।
৫. মানুষের স্বাভাবিক অধিকার
হবস বলেন, প্রকৃতির রাজ্যে প্রত্যেক মানুষের নিজস্ব জীবন রক্ষার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার সুরক্ষিত করতে গিয়েই সংঘাত তৈরি হয়।
৬. ভয় এবং নিরাপত্তা
হবসের মতে, প্রকৃতির রাজ্যে মানুষের প্রধান উদ্বেগ হলো নিরাপত্তার অভাব। এই ভয় থেকেই মানুষ সামাজিক চুক্তির মাধ্যমে একটি রাষ্ট্র বা সমাজ গঠনে আগ্রহী হয়।
৭. মানব প্রকৃতির নেতিবাচক দিক
টমাস হবস বিশ্বাস করতেন যে মানুষের প্রকৃতি স্বার্থপর এবং হিংস্র। এই প্রকৃতির কারণে সমাজে সংঘর্ষ ও বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়।
৮. সামাজিক চুক্তির ধারণা
মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণার কেন্দ্রীয় অংশ হলো সামাজিক চুক্তি। এটি একটি প্রক্রিয়া যেখানে মানুষ নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার জন্য একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
৯. রাষ্ট্রের ভূমিকা
হবসের মতে, একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রকৃতির রাজ্যের বিশৃঙ্খলা এড়ানো সম্ভব। এই রাষ্ট্র মানুষের স্বাধীনতা সীমিত করলেও সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখে।
১০. লেভায়াথান গ্রন্থের মূল বক্তব্য
হবস তার “লেভায়াথান” গ্রন্থে প্রকৃতির রাজ্যের বিশদ আলোচনা করেন। তিনি একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বকে “লেভায়াথান” বা সর্বশক্তিমান রূপে বর্ণনা করেন।
১১. স্বার্থপরতার দৃষ্টিকোণ
হবস মনে করেন, মানব প্রকৃতি এমন যে মানুষ সবসময় নিজ স্বার্থকেই অগ্রাধিকার দেয়। তবে এই স্বার্থপরতা কখনও কখনও সংঘাত সৃষ্টি করে।
১২. মৃত্যুভয় এবং সমাজ গঠন
প্রকৃতির রাজ্যের মৃত্যু এবং সংঘাতের ভয় থেকেই মানুষ একটি সমাজ গঠনের জন্য উদ্যোগী হয়। এই সমাজ তাদের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতা প্রদান করে।
১৩. ধর্মের ভূমিকা
হবসের মতে, ধর্ম রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত একটি বিষয়। এটি সামাজিক চুক্তির অংশ হিসেবে মানুষের আচরণ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
১৪. আধুনিক রাজনীতিতে হবসের প্রভাব
মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা আধুনিক রাজনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলেছে। তার সামাজিক চুক্তির ধারণা রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক তত্ত্ব হিসেবে বিবেচিত।
১৫. সমালোচনা এবং মূল্যায়ন
হবসের ধারণা সমালোচিত হলেও এটি রাষ্ট্র এবং সমাজ গঠনের একটি শক্তিশালী ভিত্তি প্রদান করে। তার ধারণা সমাজে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠায় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উপসংহার
টমাস হবসের মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কিত ধারণা সমাজ এবং রাষ্ট্রের গঠন প্রক্রিয়া বোঝার জন্য অপরিহার্য। তার সামাজিক চুক্তি তত্ত্ব আজও রাজনীতি, দর্শন এবং সমাজবিজ্ঞানে প্রাসঙ্গিক। এই ধারণা থেকে বোঝা যায়, শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কেন্দ্রীয় কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা অপরিহার্য। “মানব প্রকৃতি ও প্রকৃতির রাজ্য সম্পর্কে টমাস হবসের ধারণা” গভীরভাবে বিশ্লেষণ করলে সমাজ গঠনের মৌলিক দিকগুলো স্পষ্ট হয়।