হুমায়ুন ও শেরশাহের মধ্যকার সংঘর্ষে হুমায়ুনের ব্যর্থতার কারণ কী?
হুমায়ুন ও শেরশাহের মধ্যকার সংঘর্ষে হুমায়ুনের ব্যর্থতার কারণ কী? ভারতীয়…
হুমায়ুন ও শেরশাহের মধ্যকার সংঘর্ষে হুমায়ুনের ব্যর্থতার কারণ কী?
ভারতীয় ইতিহাসে হুমায়ুন এবং শেরশাহ সুরীর মধ্যে সংঘর্ষ একটি উল্লেখযোগ্য অধ্যায়। এটি কেবল সামরিক সংঘর্ষের গৌরবময় কাহিনি নয়, বরং রাজনৈতিক ক্ষমতার জন্য একটি ধারাবাহিক সংগ্রাম ছিল। মুঘল সম্রাট হুমায়ুন এবং আফগান শাসক শেরশাহ সুরীর মধ্যে সংঘর্ষের ফলস্বরূপ, হুমায়ুনের পরাজয় এবং পরবর্তীতে শাসনাভিযান এক অবিস্মরণীয় ঘটনা হয়ে দাঁড়ায়। তবে এই সংঘর্ষে হুমায়ুনের পরাজয়ের পেছনে কী কী কারণ ছিল, তা বিশ্লেষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২য় পত্র এর উত্তর
Degree suggestion Facebook group
হুমায়ুন ও শেরশাহের মধ্যকার সংঘর্ষে হুমায়ুনের ব্যর্থতার কারণ:
১. শাসক হিসেবে হুমায়ুনের দুর্বলতা
হুমায়ুন, বাবরের পুত্র, ভারতের মুঘল সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠার জন্য একাধিক কষ্টকর সংগ্রামের মাধ্যমে স্বীকৃতি পেয়েছিলেন। কিন্তু তার শাসনকালে তিনি পরবর্তীতে কিছু দুর্বলতা প্রদর্শন করেন যা তার শাসনকে স্থিতিশীল রাখতে বাধা সৃষ্টি করে। হুমায়ুনের শাসনকালে একটি স্থির নীতি অনুসরণ করতে পারেননি, যার ফলে তাঁর শাসন ব্যাপকভাবে সংকটাপন্ন হয়ে পড়ে। বিভিন্ন নীতির মধ্যে প্রায়ই দ্বিধাদ্বন্দ্ব দেখা যেত, ফলে শেরশাহ সুরীর মতো ক্ষমতাশালী প্রতিদ্বন্দ্বী তাকে চ্যালেঞ্জ করতে সক্ষম হন।
২. শেরশাহ সুরীর কৌশলগত দক্ষতা
শেরশাহ সুরী ছিল এক কৌশলী এবং অভিজ্ঞ সামরিক নেতা। তার শাসনকালে আফগান সাম্রাজ্যের প্রতি আগ্রহী শেরশাহ প্রাসঙ্গিকভাবে শক্তিশালী একটি সেনাবাহিনী গড়ে তোলেন। শেরশাহের প্রধান শক্তি ছিল তার সুশৃঙ্খল সামরিক কৌশল এবং যুদ্ধের পরিকল্পনা। তিনি যেমন তাঁর সেনাবাহিনীর প্রতিটি ইউনিটকে প্রশিক্ষিত করেছিলেন, তেমনি বিভিন্ন সরঞ্জাম ও যুদ্ধ কৌশলও আধুনিক করেছিলেন। ফলে, শেরশাহের সামরিক বাহিনী কার্যকরভাবে পরিকল্পিত আক্রমণ পরিচালনা করতে সক্ষম হয়েছিল।
৩. অভ্যন্তরীণ রাজনীতির অস্থিরতা
হুমায়ুনের পরাজয়ের আরেকটি প্রধান কারণ ছিল তার রাজ্য পরিচালনার অস্থিরতা। একদিকে, তার নিজের পরিবারের সদস্যদের সাথে সম্পর্কের টানাপোড়েন ছিল, অন্যদিকে, তাঁর রাজ্যকে পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে রাখতে পারছিলেন না। হুমায়ুনের ভাইদের মধ্যে দুঃখজনক পরিণতি এবং তার পিতৃতান্ত্রিক নীতি, যেগুলি ছিল রাজকীয় অস্থিরতার মূল কারণ, তাকে শেরশাহের মতো শক্তিশালী প্রতিপক্ষের কাছে দুর্বল করে তুলেছিল। হুমায়ুনের অনিশ্চিত রাজনীতি তার বিরোধীদের আরও শক্তিশালী করে তুলেছিল।
৪. শেরশাহের আর্থিক সঞ্চালনা
শেরশাহ সুরী ছিল এক দুর্দান্ত আর্থিক চিন্তাবিদ। তার রাজস্ব ব্যবস্থাপনা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল। তিনি তাঁর রাজ্যকে বিভিন্ন উপায়ে আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হন। তার একমাত্র উদ্দেশ্য ছিল শক্তিশালী সাম্রাজ্য গঠন করা এবং সেনাবাহিনীর জন্য যথেষ্ট অর্থ সংগ্রহ করা। শেরশাহের এই সক্ষমতা হুমায়ুনের জন্য বিপদজনক হয়ে দাঁড়ায়। হুমায়ুনের রাজস্ব ব্যবস্থা তেমন শক্তিশালী ছিল না, যা তার সেনাবাহিনীর পক্ষে প্রয়োজনীয় উপকরণ এবং শানদার প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে সহায়ক ছিল।
৫. পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী পরিস্থিতি
পলাশী যুদ্ধের পরবর্তী ঘটনাগুলিও হুমায়ুনের পরাজয়ের কারণ হিসেবে উল্লেখযোগ্য। পলাশী যুদ্ধের ফলে হুমায়ুন তার রাজ্য থেকে বিতাড়িত হন এবং পশ্চিমা ভারতীয় অঞ্চলে পালিয়ে যান। তিনি ফিরে আসার জন্য দীর্ঘদিন ধরে সংগ্রাম করেন, কিন্তু সেই সময় শেরশাহ সুরী তার রাজ্যকে আরও শক্তিশালী করে তোলে এবং একটি সুশৃঙ্খল প্রশাসন গড়ে তোলে।
৬. বাহিনী ও প্রযুক্তির পার্থক্য
যুদ্ধের ক্ষেত্রে বাহিনী এবং প্রযুক্তির ব্যবহারে শেরশাহ সুরী হুমায়ুনের তুলনায় একধাপ এগিয়ে ছিলেন। শেরশাহ তার বাহিনীর মধ্যে অস্ত্রশস্ত্র এবং যুদ্ধ কৌশলে আধুনিকতার ছোঁয়া এনে ছিলেন। তিনি নতুন যুদ্ধ সরঞ্জাম যেমন, সুশৃঙ্খল ক্যালভারি, স্নাইপিং, এবং বিশেষ ধরনের তলোয়ার ব্যবহারের মাধ্যমে তার বাহিনীকে শক্তিশালী করেছিলেন। অন্যদিকে, হুমায়ুনের বাহিনী তার আধুনিক প্রযুক্তির সাথে খাপ খাইয়ে নিতে ব্যর্থ হয় এবং এটি তাদের পরাজয়ের এক অন্যতম কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
৭. বিপর্যস্ত বাহিনী ও বাহিনী কন্ট্রোল
হুমায়ুনের বাহিনীর মধ্যে শৃঙ্খলা এবং নেতৃত্বের অভাব ছিল। তার অধীনে সেনারা একত্রিতভাবে লড়াই করতে পারেনি। শেরশাহ সুরী, তার পক্ষ থেকে, একটি শক্তিশালী এবং একত্রিত বাহিনী গড়ে তুলেছিলেন, যেখানে প্রতিটি সেনা সদস্যের ভূমিকা স্পষ্ট ছিল এবং যুদ্ধের সময় কোনও ধরনের বিশৃঙ্খলা দেখা দেয়নি। এই পার্থক্য যুদ্ধের ফলাফলে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল।
উপসংহার
হুমায়ুন এবং শেরশাহ সুরীর মধ্যে সংঘর্ষে হুমায়ুনের ব্যর্থতার মূল কারণ ছিল তার শাসনকৌশলের দুর্বলতা, শেরশাহের সামরিক ও আর্থিক দক্ষতা, এবং রাজ্য পরিচালনায় অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা। শেরশাহ সুরী তার সামরিক কৌশল, শক্তিশালী প্রশাসন এবং আধুনিক প্রযুক্তির সাহায্যে হুমায়ুনের বিপক্ষে জয়ী হয়েছিলেন। এ ঘটনার মাধ্যমে ভারতীয় ইতিহাসে এক নতুন দিগন্তের সূচনা হয়েছিল, যেখানে শেরশাহ সুরী অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক ও সামরিক চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হন।