হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপগুলোর বিবরণ দাও
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ গুলো ভূমিকা হিমবাহ হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের…
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ গুলো
ভূমিকা
হিমবাহ হলো পৃথিবীর প্রাকৃতিক পরিবেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ভৌগোলিক উপাদান যা ধীরে ধীরে বরফের বৃহৎ সঞ্চয় হিসেবে গঠিত হয় এবং প্রবাহিত হয়। হিমবাহের ক্রিয়ার ফলে ভূমির ওপর বিভিন্ন ধরনের পরিবর্তন ঘটে, যার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ। এই ভূমিরূপগুলো হিমবাহের গতিশীলতা, তাপমাত্রা পরিবর্তন এবং বরফের ঘর্ষণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সৃষ্টি হয়।
Degree suggestion Facebook group
হিমবাহ কী?
হিমবাহ হলো বিশাল বরফের সঞ্চয়, যা পাহাড়ি এলাকা থেকে নিচের দিকে ধীরে ধীরে প্রবাহিত হয়। এটি মূলত দীর্ঘ সময় ধরে তুষারপাত ও সংক্ষিপ্ত গলনের মাধ্যমে গঠিত হয়। যখন হিমবাহ প্রবাহিত হয়, তখন এটি নিচের পাথরের স্তরের সঙ্গে সংঘর্ষ করে এবং ভূ-পৃষ্ঠের বিভিন্ন পরিবর্তন ঘটায়।
হিমবাহের ক্ষয়ের প্রক্রিয়া
হিমবাহের মাধ্যমে ভূমির ক্ষয় তিনটি প্রধান উপায়ে ঘটে:
- ঘর্ষণ (Abrasion): হিমবাহের বরফের সঙ্গে পাথর বা নুড়ি যুক্ত হয়ে ভূ-পৃষ্ঠের ওপর ঘর্ষণের মাধ্যমে নতুন ভূমিরূপ সৃষ্টি করে।
- চ্যুতিবাদ (Plucking): বরফের সংস্পর্শে থাকা পাথর ভেঙে বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং হিমবাহের সঙ্গে প্রবাহিত হয়।
- গলন ও পুনরায় জমাট বাঁধা (Meltwater Erosion): গলিত বরফ ভূ-পৃষ্ঠের ক্ষয় ঘটিয়ে বিভিন্ন গঠন সৃষ্টি করে।
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ
হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠিত হয়, যা সাধারণত পাহাড়ি ও শীতল অঞ্চলে দেখা যায়। প্রধান হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ নিম্নে আলোচনা করা হলো:
১. ইউ-আকৃতির উপত্যকা (U-shaped Valley)
হিমবাহ দ্বারা সৃষ্ট সবচেয়ে পরিচিত ভূমিরূপ হলো ইউ-আকৃতির উপত্যকা। হিমবাহ যখন একটি নদীর ভ্যালির ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়, তখন এটি নদীর ক্ষয়কৃত ভ্যালিকে প্রশস্ত করে ইউ-আকৃতির রূপ দেয়। এটি সাধারণত খাড়া পার্শ্বপ্রান্ত ও সমতল ভূমি নিয়ে গঠিত।
২. সার্ক (Cirque)
সার্ক হলো অর্ধচন্দ্রাকৃতি বা থালার মতো গহ্বর, যা সাধারণত পাহাড়ের উচ্চ অঞ্চলে দেখা যায়। এটি তখন তৈরি হয় যখন হিমবাহ একটি নির্দিষ্ট স্থানে বরফ জমাট বাঁধে এবং পরবর্তীতে নিচের অংশ ক্ষয় করতে থাকে।
৩. অ্যারেট (Arête)
দুইটি হিমবাহ যখন একটি পাহাড়ের দুই পাশে ক্ষয় সাধন করে, তখন তাদের মাঝখানে ধারালো ও সরু পর্বতের চূড়া সৃষ্টি হয়, যাকে অ্যারেট বলা হয়। এটি সাধারণত সংকীর্ণ ও ধারালো হয়।
৪. হর্ন (Horn)
যদি চারপাশ থেকে চারটি বা ততোধিক হিমবাহ একটি পর্বতশৃঙ্গকে ক্ষয় করে, তাহলে এটি হর্ন নামক ভূমিরূপ তৈরি করে। সুইজারল্যান্ডের ম্যাটারহর্ন হলো এর উৎকৃষ্ট উদাহরণ।
৫. হ্যাংগিং ভ্যালি (Hanging Valley)
হ্যাংগিং ভ্যালি গঠিত হয় যখন একটি ছোট হিমবাহ বড় হিমবাহের সঙ্গে যুক্ত হয়। বড় হিমবাহের প্রবাহ বেশি থাকায় এটি গভীর উপত্যকা তৈরি করে, কিন্তু ছোট হিমবাহ অপেক্ষাকৃত কম ক্ষয় করে। ফলে, বড় উপত্যকার পাশে একটি ছোট উচ্চতার উপত্যকা ঝুলন্ত অবস্থায় থাকে।
৬. রোচে মাউটোনি (Roche Moutonnée)
এটি একটি অসমান ও মসৃণ পাথরের গঠন, যা হিমবাহের ঘর্ষণ দ্বারা তৈরি হয়। এর এক পাশে মসৃণ ঢাল থাকে এবং অপর পাশে খাড়া প্রান্ত থাকে, যা চ্যুতিবাদ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে গঠিত হয়।
৭. ট্রাফি (Truncated Spur)
হিমবাহ যখন একটি পর্বতের ঢালে প্রবাহিত হয়, তখন এটি পাহাড়ের তীক্ষ্ণ প্রান্তগুলিকে কেটে ফেলে এবং ঢালকে সমতল করে। এর ফলে ট্রাফি ভূমিরূপ তৈরি হয়।
৮. ফিওর্ড (Fjord)
ফিওর্ড হলো গভীর ও সংকীর্ণ জলাশয়, যা হিমবাহের ক্ষয়ের ফলে সৃষ্ট একটি ইউ-আকৃতির উপত্যকা গহ্বরে সাগরের পানি প্রবেশের মাধ্যমে তৈরি হয়। এটি সাধারণত উপকূলীয় অঞ্চলে দেখা যায়।
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপের গুরুত্ব
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ ভূতাত্ত্বিক গবেষণা, পর্যটন, পরিবেশবিদ্যা ও জলবায়ু পরিবর্তন অধ্যয়নের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এগুলোর বিশ্লেষণের মাধ্যমে বিজ্ঞানীরা অতীত জলবায়ু সম্পর্কে ধারণা পান এবং বর্তমান পরিবেশগত পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।
উপসংহার
হিমবাহের ক্ষয়জাত ভূমিরূপ প্রাকৃতিক পরিবেশের এক অনন্য উপাদান, যা হাজার বছর ধরে ভূমির গঠন পরিবর্তন করে আসছে। ইউ-আকৃতির উপত্যকা, সার্ক, অ্যারেট, হর্ন, হ্যাংগিং ভ্যালি, ফিওর্ড ইত্যাদি ভূমিরূপ প্রাকৃতিক বৈচিত্র্যের অংশ। জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে হিমবাহের দ্রুত গলন এই ভূমিরূপগুলোর অস্তিত্বকে হুমকির মুখে ফেলছে, যা পরিবেশের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলতে পারে। তাই, এই ভূতাত্ত্বিক বৈশিষ্ট্যগুলো সংরক্ষণ করা ও পর্যবেক্ষণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।