সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান মূল্যায়ন
সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান মূল্যায়ন ভূমিকা শেরশাহ সুড়ি ছিলেন এক…
সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান মূল্যায়ন
ভূমিকা
শেরশাহ সুড়ি ছিলেন এক অসাধারণ শাসক, যিনি তার স্বল্প সময়ের শাসনামলে ভারতবর্ষের প্রশাসনিক ও সামাজিক কাঠামোতে যুগান্তকারী পরিবর্তন এনেছিলেন। তার সংস্কারমূলক নীতিগুলো পরবর্তী মোঘল শাসকদের জন্য একটি শক্তিশালী ভিত্তি তৈরি করেছিল। সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান এতটাই গুরুত্বপূর্ণ ছিল যে, অনেক ইতিহাসবিদ তাকে ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শাসক হিসেবে অভিহিত করেছেন।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২য় পত্র এর উত্তর
Degree suggestion Facebook group
১. শক্তিশালী প্রশাসনিক কাঠামো
শেরশাহ সুড়ি প্রশাসনিক ব্যবস্থায় ব্যাপক সংস্কার এনেছিলেন। তিনি কেন্দ্রীয় এবং প্রাদেশিক প্রশাসনের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করেছিলেন। রাজ্যের কার্যকারিতা বৃদ্ধির জন্য প্রশাসনকে বিভিন্ন স্তরে ভাগ করেছিলেন।
২. ভূমি সংস্কার
ভূমি ব্যবস্থা সংস্কারে শেরশাহের অবদান অনন্য। তিনি রাজস্ব সংগ্রহের জন্য মাপজোকের নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করেন এবং কৃষকদের কর কমিয়ে দেন। তার ভূমি রাজস্ব নীতি পরে মোঘলদের সময়েও অনুসরণ করা হয়।
৩. টাকশালের সংস্কার
শেরশাহ সুবর্ণ ও রৌপ্য মুদ্রা প্রবর্তন করেন, যা পরবর্তী সময়ে ভারতের অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়ক হয়। তার মুদ্রা ব্যবস্থা এতটাই সফল ছিল যে, মোঘলরা তা অব্যাহত রাখে।
৪. ডাক ও যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নয়ন
সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান ডাক ব্যবস্থা উন্নয়নে অপরিসীম। তিনি ডাক ব্যবস্থা উন্নতির জন্য সারা ভারত জুড়ে সরাইখানা নির্মাণ করেন এবং ডাক বাহকদের জন্য নির্দিষ্ট ব্যবস্থা চালু করেন।
৫. নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা
শেরশাহ দুর্নীতি ও অপরাধ দমনে কঠোর ছিলেন। তার সময়কালে ডাকাতি ও লুটপাট কমে গিয়েছিল, কারণ তিনি কঠোর শাস্তির বিধান চালু করেছিলেন।
৬. রাস্তাঘাট ও মহাসড়ক নির্মাণ
তিনি ভারতের অন্যতম বিখ্যাত সড়ক গ্র্যান্ড ট্রাঙ্ক রোড নির্মাণ করেন, যা দিল্লি থেকে বাংলার সোনারগাঁও পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল। এই সড়ক যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রাখে।
৭. সেনাবাহিনী সংস্কার
শেরশাহের সামরিক সংস্কার অত্যন্ত কার্যকর ছিল। তিনি সেনাবাহিনীকে সরাসরি রাজ্যের তত্ত্বাবধানে রাখেন এবং সেনাদের বেতন সরাসরি কোষাগার থেকে প্রদান করতেন।
৮. অর্থনৈতিক উন্নয়ন
সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান অর্থনীতিতে গভীর প্রভাব ফেলে। ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রসার ঘটাতে তিনি শুল্কনীতি সহজ করেন, যাতে ব্যবসায়ীরা নির্বিঘ্নে বাণিজ্য করতে পারে।
৯. কৃষি উন্নয়ন
তিনি কৃষকদের সহায়তা করার জন্য কৃষি ঋণ ব্যবস্থা চালু করেন। তার সময়ে কৃষিজ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছিল, যা সামগ্রিক অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে।
১০. ন্যায়বিচার ও আইনি ব্যবস্থা
শেরশাহের আইন ব্যবস্থা ছিল কঠোর কিন্তু ন্যায়সঙ্গত। তিনি প্রতিটি অঞ্চলে ন্যায়বিচারের জন্য কোর্ট স্থাপন করেন এবং সুষ্ঠু বিচার ব্যবস্থা চালু করেন।
১১. ধর্মীয় সহিষ্ণুতা
শেরশাহ তার শাসনামলে ধর্মীয় সহিষ্ণুতাকে উৎসাহিত করেছিলেন। তিনি হিন্দু-মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রাখার চেষ্টা করেন।
১২. রাজস্ব ব্যবস্থার উন্নয়ন
তার রাজস্ব নীতিতে কর নির্ধারণের একটি স্বচ্ছ পদ্ধতি ছিল। তিনি কৃষকদের আয় অনুসারে কর ধার্য করতেন, যা কৃষকদের উপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করত না।
১৩. সরাইখানা ও বিশ্রামাগার নির্মাণ
শেরশাহের আমলে সড়কের পাশে বহু সরাইখানা নির্মিত হয়, যেখানে যাত্রীরা বিশ্রাম নিতে পারতেন এবং খাবারের সুবিধা পেতেন। এতে বাণিজ্য ও পরিবহন ব্যবস্থার উন্নতি ঘটে।
১৪. নৌপরিবহন ব্যবস্থা উন্নয়ন
তিনি নদী পথে বাণিজ্যের উন্নতি ঘটাতে বিভিন্ন বন্দর সংস্কার করেন, যাতে জলপথে সহজে ব্যবসা করা যায়।
১৫. শিক্ষার প্রসার
শেরশাহ শিক্ষার ওপর গুরুত্ব দিয়েছিলেন। তিনি মাদ্রাসা ও পাঠশালা নির্মাণ করেন এবং শিক্ষকদের জন্য বৃত্তির ব্যবস্থা করেন।
উপসংহার
শেরশাহ সুড়ি ছিলেন এক যুগান্তকারী শাসক, যার সংস্কারমূলক কাজগুলো পরবর্তী শাসকদের জন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছিল। সংস্কারক হিসেবে শেরশাহের অবদান শুধু তার সমকালীন সময়েই নয়, বরং ভবিষ্যৎ ভারতবর্ষের ইতিহাসেও গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তার প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং সামাজিক সংস্কার আজও ইতিহাসবিদদের গবেষণার গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।