সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণসমূহ ব্যাখ্যা কর
সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণসমূহ ভূমিকা সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা (Salinity)…
সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণসমূহ
ভূমিকা
সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা (Salinity) হল পানির মধ্যে দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ। সাধারণত, প্রতি হাজার গ্রাম (ppt) পানিতে দ্রবীভূত লবণের পরিমাণ দ্বারা এটি পরিমাপ করা হয়। গড়ে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততা ৩৫ পিপিটি (ppt) বা ৩.৫% হলেও, অঞ্চলভেদে এর তারতম্য ঘটে। প্রকৃতি, জলবায়ু, ভূগর্ভস্থ গঠন এবং মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণ একে প্রভাবিত করে।
Degree suggestion Facebook group
সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণসমূহ
১. বৃষ্টিপাতের হার
বৃষ্টিপাত সমুদ্রের লবণাক্ততা কমানোর অন্যতম প্রধান কারণ। যখন বৃষ্টিপাত বেশি হয়, তখন তা সমুদ্রের উপরিভাগের পানির ঘনত্ব হ্রাস করে, ফলে লবণের অনুপাত কমে যায়। সাধারণত নিরক্ষীয় অঞ্চলে প্রচুর বৃষ্টিপাত হওয়ায় সেখানে লবণাক্ততার হার অপেক্ষাকৃত কম থাকে।
২. বাষ্পীভবনের মাত্রা
বাষ্পীভবন (Evaporation) হল সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ। উচ্চ তাপমাত্রার কারণে পানির বাষ্পীভবন বেশি হলে, পানির তরল অংশ উবে যায় কিন্তু লবণ রয়ে যায়, ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। গ্রীষ্মপ্রধান ও মরুভূমি-সন্নিহিত উপকূলীয় এলাকায় এ কারণেই লবণাক্ততা তুলনামূলক বেশি।
৩. নদীর পানির সংযোজন
নদী যখন সমুদ্রে পতিত হয়, তখন তা মিঠা পানি সরবরাহ করে, যা লবণাক্ততা কমিয়ে দেয়। উদাহরণস্বরূপ, বিশ্বের বৃহত্তম নদীগুলোর মধ্যে আমাজন, গঙ্গা ও মেকং নদী বিশাল পরিমাণে মিঠা পানি প্রবাহিত করে, যা সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণ হয়।
৪. মহাসাগরীয় স্রোতের প্রভাব
মহাসাগরীয় স্রোত (Ocean Currents) সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের অন্যতম কারণ। ঠান্ডা স্রোত সাধারণত লবণাক্ততা কমিয়ে দেয়, কারণ এগুলো বরফ গলা পানি এবং নিম্ন লবণাক্ততার অঞ্চলের পানি নিয়ে আসে। অন্যদিকে, উষ্ণ স্রোত বেশি বাষ্পীভবন ঘটিয়ে লবণাক্ততা বাড়াতে সাহায্য করে।
৫. বরফ গলন ও সঞ্চিত বরফ
মেরু অঞ্চলে (Polar Regions) বরফ গলে গেলে বিশুদ্ধ মিঠা পানি সমুদ্রে প্রবাহিত হয়, যা লবণাক্ততা হ্রাস করে। বিপরীতে, যখন সমুদ্রের পানি বরফে পরিণত হয়, তখন লবণ বেরিয়ে এসে পানির মধ্যে থেকে যায়, ফলে লবণাক্ততা বৃদ্ধি পায়। এটি মৌসুমভেদে লবণাক্ততার পরিবর্তনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ একটি কারণ।
৬. সমুদ্রের গভীরতা ও অবস্থান
গভীর সমুদ্রের তুলনায় উপকূলীয় অঞ্চলে লবণাক্ততা কম থাকে, কারণ সেখানে নদীর পানি মিশে লবণাক্ততা হ্রাস করে। এছাড়া, নিরক্ষীয় অঞ্চলের তুলনায় মেরু ও নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে লবণাক্ততা পরিবর্তনশীল হয়।
৭. ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহ
কিছু কিছু ক্ষেত্রে ভূগর্ভস্থ জলপ্রবাহও সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণ হতে পারে। ভূগর্ভস্থ উৎস থেকে নির্গত পানি মিঠা হলে লবণাক্ততা কমে এবং লবণাক্ত হলে এটি বৃদ্ধি পায়।
৮. টেকটোনিক কার্যকলাপ
ভূমিকম্প ও আগ্নেয়গিরির অগ্ন্যুৎপাত সমুদ্রের নিচে লবণাক্ততার পরিবর্তন ঘটাতে পারে। আগ্নেয়গিরির লাভা ও গ্যাসের সংযোজন লবণাক্ততা বাড়িয়ে তুলতে পারে, বিশেষ করে গভীর সমুদ্রে।
৯. মানবসৃষ্ট কার্যকলাপ
মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কার্যকলাপ যেমন, লবণ উৎপাদন, শিল্প-কারখানা থেকে বর্জ্য নির্গমন, কৃষিজ ও নগরায়ণের কারণে লবণাক্ততা পরিবর্তিত হতে পারে। কৃষিক্ষেত্রে অতিরিক্ত সার ও রাসায়নিক পদার্থ ব্যবহারের ফলে সমুদ্রের পানিতে লবণের পরিমাণ বেড়ে যায়।
১০. জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব
জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে বৈশ্বিক উষ্ণতা বৃদ্ধি পাচ্ছে, যা বরফ গলন এবং বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন ঘটাচ্ছে। এর ফলে সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্য দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
উপসংহার
সমুদ্রের পানির লবণাক্ততার তারতম্যের কারণসমূহ বহুবিধ এবং জটিল। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট কারণগুলো একে পরিবর্তিত করে। বৃষ্টিপাত, বাষ্পীভবন, নদীর পানি, মহাসাগরীয় স্রোত, বরফ গলন, ভূগর্ভস্থ প্রবাহ, টেকটোনিক কার্যকলাপ, এবং জলবায়ু পরিবর্তন একসঙ্গে কাজ করে সমুদ্রের লবণাক্ততার বিভিন্নতা সৃষ্টি করে। ভবিষ্যতে জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে এর পরিবর্তন আরও দ্রুত ঘটবে বলে বিজ্ঞানীরা পূর্বাভাস দিচ্ছেন। সুতরাং, এই পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ ও নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।