সমালোচনাসহ প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বটি ব্যাখ্যা কর
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব ভূমিকা প্লেটো প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম,…
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব
ভূমিকা
প্লেটো প্রাচীন গ্রিক দার্শনিকদের মধ্যে অন্যতম, যার চিন্তাধারা আধুনিক দর্শন, রাজনীতি ও সমাজবিজ্ঞানে ব্যাপক প্রভাব ফেলেছে। তার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ তত্ত্বগুলোর মধ্যে “প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব” বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব মূলত তার বিখ্যাত গ্রন্থ “দ্য রিপাবলিক”-এ বিস্তারিতভাবে ব্যাখ্যা করা হয়েছে, যেখানে তিনি একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থা কেমন হওয়া উচিত তা বিশদভাবে বর্ণনা করেছেন। তবে তার এই তত্ত্ব সমালোচনার ঊর্ধ্বে নয়।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২য় পত্র এর উত্তর
Degree suggestion Facebook group
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বের মূল ধারণা
প্লেটোর মতে, একটি আদর্শ রাষ্ট্রে সাম্যবাদী নীতি অনুসরণ করা উচিত, যাতে সমাজের প্রতিটি সদস্য তাদের নিজস্ব দায়িত্ব পালন করে এবং ব্যক্তিগত সম্পত্তির মালিকানা পরিহার করে। তার সাম্যবাদ তত্ত্ব মূলত তিনটি স্তম্ভের ওপর প্রতিষ্ঠিত—
১. সমাজকে তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা
প্লেটোর মতে, একটি রাষ্ট্রকে কার্যকরভাবে পরিচালনার জন্য তিনটি শ্রেণিতে বিভক্ত করা উচিত—
- দার্শনিক রাজারা (শাসক শ্রেণি)
- যোদ্ধারা (রক্ষক শ্রেণি)
- কৃষক ও কারিগররা (উৎপাদক শ্রেণি)
এই শ্রেণিবিন্যাসের মাধ্যমে তিনি বোঝাতে চেয়েছেন যে, সমাজের প্রতিটি ব্যক্তি তাদের যোগ্যতা অনুযায়ী ভূমিকা পালন করবে এবং এতে সাম্য বজায় থাকবে।
২. ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পরিবার পরিত্যাগ
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বে বলা হয়েছে যে, শাসক ও রক্ষক শ্রেণির সদস্যদের ব্যক্তিগত সম্পত্তি ও পারিবারিক বন্ধন থাকবে না। এর ফলে তারা ব্যক্তিগত স্বার্থের পরিবর্তে কেবলমাত্র রাষ্ট্রের মঙ্গলের জন্য কাজ করবে।
৩. নারীর সাম্যতা
সমসাময়িক গ্রিক সমাজে নারীদের অবস্থা খুবই সীমাবদ্ধ ছিল, তবে প্লেটো মনে করতেন যে নারী ও পুরুষ উভয়ই সমান ক্ষমতাসম্পন্ন এবং যোগ্যতা অনুযায়ী তারা একই দায়িত্ব পালন করতে পারবে।
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বের সুবিধা
৪. সামাজিক সাম্য নিশ্চিত করা
এই তত্ত্বের প্রধান সুবিধা হলো এটি সমাজে ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য কমিয়ে আনতে সাহায্য করে। যেহেতু ব্যক্তিগত সম্পত্তি নিষিদ্ধ, তাই আর্থিক অসাম্য কম থাকবে।
৫. নৈতিক ও আদর্শবাদী সমাজ
প্লেটোর মতে, তার প্রস্তাবিত সাম্যবাদ রাষ্ট্রব্যবস্থায় মানুষের স্বার্থপরতা কমে যাবে এবং তারা নৈতিক ও আদর্শবাদী জীবনযাপন করবে।
৬. দক্ষতার ভিত্তিতে কাজ বণ্টন
প্লেটো মনে করতেন যে, প্রতিটি ব্যক্তির একটি নির্দিষ্ট দক্ষতা রয়েছে এবং তারা যদি সেই অনুযায়ী কাজ করে, তবে সমাজে সুষ্ঠু পরিচালনা সম্ভব হবে।
৭. শাসকদের স্বার্থহীনতা নিশ্চিত করা
যেহেতু শাসকরা সম্পত্তি ও পরিবারবিহীন, তাই তারা ব্যক্তিগত স্বার্থে নয়, বরং জনগণের কল্যাণের জন্য কাজ করবে।
৮. রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা বৃদ্ধি
এই সাম্যবাদ তত্ত্বের মাধ্যমে প্লেটো মনে করেন যে, সমাজে বিশৃঙ্খলা কমে যাবে এবং এটি একটি সুসংগঠিত ও স্থিতিশীল রাষ্ট্র গঠনে সহায়ক হবে।
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বের সমালোচনা
৯. ব্যক্তিগত স্বাধীনতার অভাব
অনেক সমালোচক মনে করেন যে, প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব ব্যক্তিগত স্বাধীনতাকে হ্রাস করে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো ব্যক্তিগত সম্পদ ও পরিবার থাকা, যা এই তত্ত্বে নিষিদ্ধ করা হয়েছে।
১০. বাস্তব জীবনে প্রয়োগ অসম্ভব
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব অনেকটাই একটি আদর্শবাদী কল্পনা। বাস্তবে মানুষ কখনোই সম্পূর্ণভাবে ব্যক্তিগত স্বার্থ ত্যাগ করতে পারে না।
১১. শাসক শ্রেণির একচ্ছত্র আধিপত্য
প্লেটোর তত্ত্ব অনুযায়ী, দার্শনিক-রাজারা সর্বোচ্চ ক্ষমতা ভোগ করবে, যা এক ধরনের একনায়কতন্ত্রের দিকে ঠেলে দিতে পারে।
১২. সম্পত্তিহীন জীবন অমানবিক
মানুষের মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যক্তিগত সম্পত্তি থাকা। কিন্তু প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব ব্যক্তিগত সম্পত্তিকে নিষিদ্ধ করে, যা অনেকের কাছে অমানবিক মনে হতে পারে।
১৩. শ্রেণিবিন্যাসের অসুবিধা
এই তত্ত্ব অনুযায়ী, মানুষকে ছোটবেলা থেকেই একটি নির্দিষ্ট শ্রেণিতে ভাগ করে দেওয়া হবে, যা ব্যক্তিগত বিকাশের সুযোগ কমিয়ে দেয়।
১৪. সাম্যবাদ ও স্বৈরতন্ত্রের পার্থক্য কম
অনেক সমালোচক মনে করেন যে, প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব কার্যত স্বৈরতান্ত্রিক সমাজ গঠনের পথে নিয়ে যেতে পারে, যেখানে ব্যক্তিগত মতামত ও স্বাধীনতার স্থান থাকবে না।
১৫. আধুনিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সাংঘর্ষিক
আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থায় ব্যক্তি স্বাধীনতা ও মত প্রকাশের অধিকারের গুরুত্ব রয়েছে, যা প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্বের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
উপসংহার
প্লেটোর সাম্যবাদ তত্ত্ব একটি আদর্শ রাষ্ট্রব্যবস্থার স্বপ্ন দেখালেও, বাস্তবিকভাবে এটি বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন। যদিও এটি সামাজিক সাম্যতা, নৈতিকতা ও দক্ষতার ওপর জোর দেয়, তবে এটি ব্যক্তিগত স্বাধীনতা, সম্পত্তির অধিকার এবং বাস্তব জীবনের বাস্তবতা সম্পর্কে অনেক প্রশ্ন উত্থাপন করে। এই তত্ত্বের কিছু দিক আজকের সমাজেও গুরুত্বপূর্ণ, তবে এটি সম্পূর্ণরূপে কার্যকর করা সম্ভব নয়।