প্রথা কী? প্রথা মান্য করা হয় কেন?

প্রথা কী? প্রথা মান্য করা হয় কেন? ভূমিকা মানুষ সামাজিক…

প্রথা কী? প্রথা মান্য করা হয় কেন?

ভূমিকা

মানুষ সামাজিক প্রাণী, এবং সমাজে বসবাসের জন্য নির্দিষ্ট নিয়ম ও রীতি মেনে চলতে হয়। সময়ের সাথে সাথে কিছু নির্দিষ্ট আচার-আচরণ ও অভ্যাস সমাজে প্রতিষ্ঠিত হয়, যা পরবর্তীতে প্রথা হিসেবে গৃহীত হয়। প্রথা সমাজের সাংস্কৃতিক ও ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতার অংশ এবং মানুষের জীবনযাত্রাকে প্রভাবিত করে। কিন্তু আসলে প্রথা কী? কেন মানুষ প্রথা মেনে চলে? চলুন এই বিষয়গুলো বিশদভাবে বিশ্লেষণ করি।

ডিগ্রি পরিক্ষার সকল বিষয়ের সাজেশন ও এর উত্তর

Degree suggestion Facebook group

প্রথার সংজ্ঞা

বাংলা একাডেমির সংজ্ঞা অনুযায়ী, “প্রথা হল কোনো নির্দিষ্ট সমাজ বা সম্প্রদায়ের মধ্যে গৃহীত ও দীর্ঘদিন ধরে প্রচলিত সামাজিক রীতি, যা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে হস্তান্তরিত হয়।” সহজভাবে বলতে গেলে, এটি সমাজের স্বীকৃত আচরণ বা রীতিনীতি, যা দীর্ঘকাল ধরে পালন করা হয় এবং সমাজের সদস্যরা সেটাকে মান্য করার জন্য স্বপ্রণোদিত বা সামাজিক বাধ্যবাধকতার মাধ্যমে উদ্বুদ্ধ হন।

বিখ্যাত নৃতাত্ত্বিক ব্রনিস্লাভ মালিনোস্কি (Bronislaw Malinowski) প্রথাকে সংজ্ঞায়িত করেছেন এইভাবে—“প্রথা সমাজে শৃঙ্খলা বজায় রাখার জন্য গৃহীত নিয়মিত কার্যপ্রণালী বা অভ্যাস, যা সময়ের সাথে সংস্কৃতির অংশ হয়ে ওঠে।” এই সংজ্ঞাগুলো থেকে বোঝা যায়, প্রথা সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ এবং এটি সামাজিক সুসংহতি বজায় রাখতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

প্রথার ধরন

প্রথা বিভিন্ন ধরনের হতে পারে, যার মধ্যে প্রধান কিছু প্রকারভেদ হলো:

  1. সামাজিক প্রথা: সামাজিক সম্পর্ক ও আচার-আচরণের মাধ্যমে গড়ে ওঠা রীতিনীতি, যেমন—অতিথি আপ্যায়ন, সম্মান প্রদর্শন।
  2. ধর্মীয় প্রথা: নির্দিষ্ট ধর্মীয় বিশ্বাস ও আচার-অনুষ্ঠান নিয়ে গঠিত প্রথা, যেমন—উপবাস রাখা, তীর্থযাত্রা করা।
  3. সাংস্কৃতিক প্রথা: নৃত্য, সংগীত, পোশাক, খাদ্যাভ্যাসের মতো সংস্কৃতিগত অনুশীলন, যা একটি জাতির পরিচিতি গড়ে তোলে।
  4. আইনগত বা প্রাতিষ্ঠানিক প্রথা: রাষ্ট্রীয় বা প্রতিষ্ঠানগত নিয়ম-কানুন, যেমন—বিচারব্যবস্থায় প্রচলিত রীতি বা সংবিধান অনুসরণ।
  5. অর্থনৈতিক প্রথা: নির্দিষ্ট ব্যবসায়িক বা লেনদেন সংক্রান্ত ঐতিহ্য, যেমন—হাট-বাজারের নিয়মনীতি।

মানুষ প্রথা মান্য করে কেন?

প্রথা মান্য করার পিছনে বিভিন্ন কারণ রয়েছে। নিম্নে কয়েকটি প্রধান কারণ আলোচনা করা হলো:

১. সামাজিক সংহতি ও স্থিতিশীলতা

প্রথা সমাজের মধ্যে একটি অভিন্ন কাঠামো তৈরি করে এবং সামাজিক স্থিতিশীলতা বজায় রাখে। সমাজের প্রত্যেক ব্যক্তি যদি নিজের নিয়ম তৈরি করতে থাকে, তাহলে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হতে পারে। তাই পূর্বপুরুষদের অনুসৃত ও প্রতিষ্ঠিত নিয়মগুলো বজায় রাখা সমাজের শৃঙ্খলা ও ঐক্যের জন্য অপরিহার্য।

২. সাংস্কৃতিক পরিচয় সংরক্ষণ

প্রথা একটি জাতির ঐতিহ্য ও সংস্কৃতির অংশ। এটি একটি জনগোষ্ঠীর আত্মপরিচয় বহন করে। কোনো প্রথার বিলুপ্তি মানে ঐ জাতির সংস্কৃতির একটি অংশ হারিয়ে যাওয়া। তাই মানুষ তার নিজস্ব ঐতিহ্য টিকিয়ে রাখার জন্য প্রথা অনুসরণ করে।

৩. নৈতিক ও ধর্মীয় কারণ

অনেক প্রথা ধর্মীয় অনুশাসনের সাথে জড়িত থাকে, যা মানুষকে সৎ ও নৈতিক পথে পরিচালিত করে। ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে অনেকেই নির্দিষ্ট রীতি-নীতি পালন করেন, যেমন—উপবাস, নামাজ বা প্রার্থনা করা।

৪. সামাজিক স্বীকৃতি ও গ্রহণযোগ্যতা

সমাজে বসবাস করতে হলে সমাজের নিয়ম মেনে চলতে হয়। কোনো ব্যক্তি যদি প্রচলিত প্রথাগুলো মান্য না করে, তাহলে তাকে সমাজের অন্যরা বিরূপভাবে গ্রহণ করতে পারে। তাই সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়ার জন্য মানুষ প্রচলিত প্রথা অনুসরণ করে।

৫. মানসিক নিরাপত্তা ও অভ্যাস

প্রথা অনুসরণ করলে মানুষ তার চারপাশের পরিবেশের সাথে সহজে খাপ খাইয়ে নিতে পারে। মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি হলো পরিচিত নিয়ম মেনে চলা, কারণ এটি তাকে নিরাপত্তা ও নিশ্চয়তা দেয়। নতুন কিছু গ্রহণ করতে হলে মানুষকে মানসিকভাবে প্রস্তুত হতে হয়, যা অনেকের জন্য কঠিন হতে পারে। তাই প্রথার প্রতি মানুষের স্বাভাবিক আকর্ষণ থাকে।

প্রথার পরিবর্তন ও আধুনিক সমাজ

যদিও প্রথা গুরুত্বপূর্ণ, তবে সময়ের সাথে সাথে অনেক প্রথার পরিবর্তন হয় বা বিলুপ্ত হয়। আধুনিক সমাজে অনেক পুরাতন প্রথা এখন অপ্রাসঙ্গিক হয়ে পড়েছে, যেমন—বাল্যবিবাহ, সতীদাহ প্রথা ইত্যাদি।

বর্তমান যুগে প্রযুক্তি ও বিজ্ঞান প্রথাকে অনেক ক্ষেত্রে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলেছে। কিছু প্রথা পরিবর্তনের মাধ্যমে আধুনিক রূপ ধারণ করেছে, যেমন—আগে মানুষ পত্রের মাধ্যমে যোগাযোগ করত, এখন তা ই-মেইল ও সামাজিক মাধ্যমে স্থানান্তরিত হয়েছে।

উপসংহার

প্রথা মানবসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা সামাজিক স্থিতিশীলতা, সাংস্কৃতিক পরিচয় ও নৈতিক মূল্যবোধ রক্ষায় সহায়ক। মানুষ প্রথা অনুসরণ করে কারণ এটি তাকে সমাজে গ্রহণযোগ্যতা, নিরাপত্তা ও আত্মপরিচয়ের অনুভূতি প্রদান করে। তবে, প্রতিটি প্রথাকে সময়ের সাথে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন, যাতে এটি মানুষের কল্যাণে কার্যকরী থাকে এবং সমাজের উন্নয়নে সহায়তা করে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *