পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ দাও

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের…

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের বিবরণ

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ইতিহাসে পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের অর্থনৈতিক বৈষম্য এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। ১৯৪৭ সালের পর থেকে ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত এই বৈষম্য রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক কারণে গভীর সংকটের সৃষ্টি করে। এই প্রবন্ধে “পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যে”র প্রভাব ও কারণ বিশ্লেষণ করা হয়েছে।

ডিগ্রি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ১ম পত্র সাজেশন


১. বৈষম্যের সূচনা ও পটভূমি

১৯৪৭ সালের দেশভাগের পর পাকিস্তান দুটি অংশে বিভক্ত হয়: পূর্ব পাকিস্তান (বর্তমান বাংলাদেশ) ও পশ্চিম পাকিস্তান। রাষ্ট্রীয় অর্থনীতি এবং প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক ছিল।


২. সম্পদের বণ্টনে বৈষম্য

পূর্ব পাকিস্তানের প্রাকৃতিক সম্পদ, বিশেষ করে পাট, পাকিস্তানের মোট রপ্তানি আয়ের ৭০% যোগান দিত। তবে সেই আয়ের বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো।


৩. বাজেট বণ্টনে অসমতা

১৯৫০-৬০-এর দশকে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ জনসংখ্যায় বেশি হলেও বাজেটের মাত্র ২০-৩০% এই অঞ্চলে বরাদ্দ করা হতো। এতে অবকাঠামো উন্নয়ন পিছিয়ে পড়ে।


৪. শিল্পায়নের অসম উন্নয়ন

পশ্চিম পাকিস্তানে শিল্প খাতে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হলেও পূর্ব পাকিস্তানে শিল্পায়ন প্রক্রিয়া ছিল নগণ্য। এতে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে বঞ্চিত হয়।


৫. রপ্তানি আয়ের অসম ব্যবহার

পাট পূর্ব পাকিস্তানের প্রধান অর্থনৈতিক সম্পদ ছিল। রপ্তানি আয়ের ৭০%-এর বেশি পাট থেকে আসলেও এর বেশিরভাগই পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো।


৬. বিদেশি ঋণ বণ্টনের বৈষম্য

পাকিস্তানের নেওয়া বিদেশি ঋণের ৮০%-এর বেশি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রকল্পে ব্যয় করা হয়। পূর্ব পাকিস্তান ঋণের দায়ভার বহন করলেও উন্নয়ন থেকে বঞ্চিত ছিল।


৭. শিক্ষাখাতে বৈষম্য

পশ্চিম পাকিস্তানে শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পেলেও পূর্ব পাকিস্তানের শিক্ষাখাতে বরাদ্দ ছিল অপ্রতুল। ফলে উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে পূর্ব পাকিস্তান।


৮. সামরিক খাতে বৈষম্য

পাকিস্তানের সামরিক বাজেটের ৭৫% পশ্চিম পাকিস্তানের সেনাবাহিনীতে ব্যয় করা হতো। পূর্ব পাকিস্তানের নিরাপত্তা এবং প্রতিরক্ষায় ছিল চরম অবহেলা।


৯. প্রশাসনিক বৈষম্য

পাকিস্তানের প্রশাসনিক কাঠামো ছিল পশ্চিম পাকিস্তান কেন্দ্রিক। উচ্চপদস্থ সরকারি চাকরিতে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য।


১০. অবকাঠামো উন্নয়নে বৈষম্য

পূর্ব পাকিস্তানে সড়ক, রেলপথ এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পগুলোতে খুব কমই বিনিয়োগ করা হতো। পশ্চিম পাকিস্তানে এসব খাতে ব্যাপক উন্নয়ন হয়েছিল।


১১. বাণিজ্যিক কেন্দ্রের অসম উন্নয়ন

পূর্ব পাকিস্তানের চট্টগ্রাম বন্দর আন্তর্জাতিক মানে উন্নীত করার পরিবর্তে করাচিকে বাণিজ্যিক কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলা হয়।


১২. কৃষিখাতে বৈষম্য

পূর্ব পাকিস্তানে কৃষি অর্থনীতি প্রধান হলেও আধুনিক কৃষি যন্ত্রপাতি ও সার সরবরাহে বৈষম্য ছিল। ফলে কৃষি উৎপাদনে পূর্ব পাকিস্তান পিছিয়ে পড়ে।


১৩. দারিদ্র্য হার ও বৈষম্য

১৯৭১ সালের পূর্বে পূর্ব পাকিস্তানের দারিদ্র্যের হার ৬০%-এর বেশি ছিল। পশ্চিম পাকিস্তানে তুলনামূলকভাবে দারিদ্র্যের হার কম ছিল।


১৪. সাংস্কৃতিক অবহেলা ও বৈষম্য

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণের ভাষা, সংস্কৃতি এবং ঐতিহ্যকে অবমূল্যায়ন করে পশ্চিম পাকিস্তান নিজস্ব সাংস্কৃতিক আধিপত্য প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে।


১৫. বৈষম্যের প্রভাব ও মুক্তিযুদ্ধের সূত্রপাত

এই দীর্ঘমেয়াদী অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং বঞ্চনা পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে বিক্ষুব্ধ করে তোলে। এর ফলস্বরূপ, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয় ঘটে।


পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রভাব

পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্য শুধু একটি অঞ্চলকে পিছিয়ে দেয়নি, বরং এটি একটি জাতির মনোভাব ও আত্মপরিচয়ের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে।


FAQs

প্রশ্ন ১: পূর্ব ও পশ্চিম পাকিস্তানের মধ্যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের প্রধান কারণ কী ছিল?
উত্তর: প্রশাসনিক কেন্দ্রিকতা, বাজেট বণ্টনে বৈষম্য, এবং রপ্তানি আয়ের অসম ব্যবহারই এর প্রধান কারণ।

প্রশ্ন ২: পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনীতি কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল?
উত্তর: রপ্তানি আয়ের বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যয় হওয়ায় পূর্ব পাকিস্তানের অবকাঠামো উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থান পিছিয়ে পড়ে।

প্রশ্ন ৩: বৈষম্য নিরসনে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কী পদক্ষেপ নিয়েছিল?
উত্তর: দীর্ঘমেয়াদী বৈষম্যের কারণে পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীনতা অর্জন করে।

প্রশ্ন ৪: অর্থনৈতিক বৈষম্যের পাশাপাশি আর কী ধরনের বৈষম্য ছিল?
উত্তর: সাংস্কৃতিক, প্রশাসনিক, সামরিক, এবং শিক্ষাক্ষেত্রে বৈষম্য ছিল।

প্রশ্ন ৫: অর্থনৈতিক বৈষম্যের ফলাফল কী হয়েছিল?
উত্তর: এই বৈষম্য মুক্তিযুদ্ধের জন্ম দেয় এবং স্বাধীন বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠা হয়।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *