চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সংজ্ঞা দাও। এর বৈশিষ্ট্য লিখ।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সংজ্ঞা দাও। এর বৈশিষ্ট্য লিখ। ভূমিকা সমাজ, রাজনীতি…
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সংজ্ঞা দাও। এর বৈশিষ্ট্য লিখ।
ভূমিকা
সমাজ, রাজনীতি ও অর্থনীতির জগতে বিভিন্ন গোষ্ঠী তাদের স্বার্থ রক্ষার জন্য বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করে। এদের মধ্যে এক ধরনের গোষ্ঠী হলো চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী (Pressure Group), যারা সরাসরি রাজনৈতিক দল বা সরকার পরিচালনার অংশ না হয়েও নীতিনির্ধারণ ও সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে। এ ধরনের গোষ্ঠীগুলো বিভিন্ন সামাজিক, অর্থনৈতিক, পেশাগত কিংবা আদর্শগত স্বার্থ নিয়ে কাজ করে।
ডিগ্রি পরিক্ষার সকল বিষয়ের সাজেশন ও এর উত্তর
Degree suggestion Facebook group
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর সংজ্ঞা
বিভিন্ন বিশেষজ্ঞ ও সংস্থার সংজ্ঞা অনুযায়ী চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীকে নিম্নলিখিতভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়—
- অক্সফোর্ড ডিকশনারি: “A pressure group is an organized group that seeks to influence government policy or business decisions without directly seeking political office.”
(একটি সংগঠিত গোষ্ঠী, যা সরাসরি রাজনৈতিক অফিস দখলের চেষ্টা না করেও সরকারী নীতি বা ব্যবসায়িক সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করে।) - অ্যান্ড্রু হেইউড এর মতে (Andrew Heywood): “Pressure groups are organizations that seek to influence public policy and government decisions without contesting elections.”
(প্রেসার গ্রুপ হল এমন সংস্থা যা নির্বাচন না করেও জননীতি এবং সরকারি সিদ্ধান্ত প্রভাবিত করতে চায়।) - ড. জর্জ জি. উইলসন (Dr. George G. Wilson): “A pressure group is a group of people organized to promote or defend a common interest.”
(চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী হল এমন একটি সংগঠিত গোষ্ঠী যা একটি সাধারণ স্বার্থ রক্ষা বা প্রচার করার জন্য কাজ করে।)
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর বৈশিষ্ট্য
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর প্রধান বৈশিষ্ট্যগুলো হলো—
- সরকারের অংশ নয়: তারা রাজনৈতিক দল বা সরকার পরিচালনার অংশ নয়, তবে নীতিনির্ধারণ প্রক্রিয়ায় প্রভাব বিস্তার করতে চায়।
- নির্দিষ্ট লক্ষ্য ও স্বার্থ সংরক্ষণ: তাদের একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্য থাকে, যেমন কৃষকের স্বার্থ রক্ষা, ব্যবসায়িক সুবিধা আদায় বা পরিবেশ সংরক্ষণ।
- নির্বাচনে অংশগ্রহণ না করা: তারা সরাসরি রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতায় অংশ নেয় না, তবে রাজনৈতিক দল ও প্রশাসনের ওপর প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করে।
- সচেতনতা বৃদ্ধি ও লবিং করা: তারা গণমাধ্যম, জনমত তৈরি, গবেষণা, প্রতিবাদ ও লবিং-এর মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর শ্রেণিবিন্যাস
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী বিভিন্ন ধরণের হতে পারে। সাধারণত এগুলোকে নিম্নলিখিত ভাগে ভাগ করা হয়—
১. অর্থনৈতিক চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী
এই গোষ্ঠীগুলো সাধারণত শিল্প, বাণিজ্য, কৃষি, ব্যাংক বা ব্যবসায়ী সম্প্রদায়ের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে।
উদাহরণ:
- বাংলাদেশে FBCCI (Federation of Bangladesh Chambers of Commerce and Industry)
- যুক্তরাষ্ট্রে American Chamber of Commerce
২. সামাজিক ও মানবাধিকার গোষ্ঠী
এরা সাধারণত সামাজিক উন্নয়ন, মানবাধিকার, নারী ও শিশু অধিকার, পরিবেশ সংরক্ষণ ইত্যাদি নিয়ে কাজ করে।
উদাহরণ:
- ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল (দুর্নীতি বিরোধী সংগঠন)
- অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল (মানবাধিকার সংগঠন)
৩. আদর্শভিত্তিক গোষ্ঠী
কিছু গোষ্ঠী ধর্ম, রাজনৈতিক মতাদর্শ বা নৈতিকতার ভিত্তিতে নীতি-নির্ধারণ প্রক্রিয়ায় চাপ সৃষ্টি করে।
উদাহরণ:
- হিউম্যান রাইটস ওয়াচ
- গ্রিনপিস (পরিবেশবাদী সংগঠন)
৪. পেশাভিত্তিক গোষ্ঠী
এই ধরনের গোষ্ঠীগুলো নির্দিষ্ট পেশাজীবীদের স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে।
উদাহরণ:
- ডাক্তারদের সংগঠন (বিএমএ – বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন)
- শিক্ষক সংগঠন
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর কার্যক্রম ও কৌশল
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীগুলো সাধারণত বিভিন্ন উপায়ে সরকারের ওপর প্রভাব বিস্তার করার চেষ্টা করে। তাদের কিছু প্রধান কৌশল হলো—
- লবিং (Lobbying): সরকারের নীতি-নির্ধারকদের সঙ্গে সংলাপ করে নিজেরা সুবিধা আদায়ের চেষ্টা করে।
- গণমাধ্যম ব্যবহার: জনমত গঠনের জন্য প্রচার-প্রচারণা চালায়।
- বিক্ষোভ ও আন্দোলন: জনসচেতনতা বৃদ্ধি ও দাবি আদায়ের জন্য রাস্তায় আন্দোলন সংগঠিত করে।
- আইনি লড়াই: কোনো আইন বা সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করতে আদালতে মামলা করে।
- গবেষণা ও প্রতিবেদন প্রকাশ: নীতিনির্ধারকদের প্রভাবিত করার জন্য গবেষণা প্রতিবেদন ও পরিসংখ্যান প্রকাশ করে।
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠীর ইতিবাচক ও নেতিবাচক প্রভাব
ইতিবাচক প্রভাব
✅ গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করে, কারণ এটি জনগণের মতামত ও স্বার্থ প্রতিফলিত করে।
✅ দুর্নীতি কমাতে ভূমিকা রাখে, যেমন দুর্নীতিবিরোধী সংগঠনগুলো।
✅ পরিবেশ সংরক্ষণ ও মানবাধিকার রক্ষায় সহায়তা করে।
নেতিবাচক প্রভাব
❌ অনেক সময় গোষ্ঠীগুলো বিশেষ স্বার্থ রক্ষায় অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করে, যা নীতিনির্ধারণকে পক্ষপাতদুষ্ট করে তুলতে পারে।
❌ অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী গোষ্ঠীগুলো রাজনৈতিক দুর্নীতি বাড়াতে পারে।
❌ অতিরিক্ত বিক্ষোভ বা আন্দোলন সমাজে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে পারে।
উপসংহার
চাপসৃষ্টিকারী গোষ্ঠী আধুনিক গণতান্ত্রিক সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তারা নীতিনির্ধারকদের সচেতন করে, দুর্নীতি প্রতিরোধ করে এবং সমাজের বিভিন্ন অংশের স্বার্থ রক্ষায় কাজ করে। তবে এর অপব্যবহারও হতে পারে, বিশেষ করে যদি কোনো গোষ্ঠী নিজেদের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে গিয়ে জনসাধারণের বৃহত্তর স্বার্থকে ক্ষতিগ্রস্ত করে। সঠিক নীতিমালা ও জবাবদিহির মাধ্যমে এই গোষ্ঠীগুলোকে ইতিবাচকভাবে কাজে লাগানো সম্ভব, যা একটি ন্যায়সঙ্গত ও সুষম সমাজ গঠনে সহায়তা করবে।