আব্বাসীয় কারা? আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ আলোচনা কর।

আব্বাসীয় কারা? আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ ভূমিকা ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসীয়…

আব্বাসীয় কারা? আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ

ভূমিকা

ইসলামের ইতিহাসে আব্বাসীয় খিলাফত একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। উমাইয়া খিলাফতের পর আব্বাসীয়রা ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণ করে এবং প্রায় পাঁচ শতকের বেশি সময় ধরে মুসলিম বিশ্ব শাসন করে। তবে শেষ পর্যন্ত নানা রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক কারণে তাদের পতন ঘটে। এই নিবন্ধে আমরা “আব্বাসীয় কারা? আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ” নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করব।

আব্বাসীয় কারা?

আব্বাসীয় খিলাফত ৭৫০ সালে উমাইয়া খিলাফতকে পরাজিত করে ইসলামের নেতৃত্ব গ্রহণ করে। আব্বাসীয়রা নবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর চাচা আব্বাস ইবনে আবদুল মুত্তালিবের বংশধর ছিলেন। তাদের শাসনামল ৭৫০ সাল থেকে ১২৫৮ সাল পর্যন্ত স্থায়ী ছিল। আব্বাসীয় শাসনের প্রধান কেন্দ্র ছিল বাগদাদ, যা ইসলামিক সভ্যতার স্বর্ণযুগের সূচনা করে।

আব্বাসীয় খিলাফতের প্রধান বৈশিষ্ট্য

  1. বাগদাদ প্রতিষ্ঠা: আব্বাসীয়রা বাগদাদ শহর গড়ে তোলে, যা ইসলামের জ্ঞান-বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
  2. সাংস্কৃতিক বিকাশ: গণিত, астрономি, চিকিৎসা ও দর্শনের বিকাশ ঘটে।
  3. বৈজ্ঞানিক উন্নয়ন: আব্বাসীয় যুগে ‘বায়তুল হিকমা’ (House of Wisdom) প্রতিষ্ঠিত হয়।
  4. প্রশাসনিক দক্ষতা: প্রশাসনকে আরও সুসংগঠিত করতে পারসিয়ান ও অন্যান্য প্রশাসনিক কাঠামো গ্রহণ করা হয়।
  5. বাণিজ্যের প্রসার: আব্বাসীয়রা সিল্ক রোডের মাধ্যমে চীন, ভারত ও ইউরোপের সাথে বাণিজ্য সম্প্রসারিত করে।

আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ

১. রাজনৈতিক দুর্বলতা

  • আব্বাসীয় খলিফাদের ক্ষমতা ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ে। সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষমতা হারিয়ে তারা নামমাত্র শাসকে পরিণত হয়।

২. অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহ

  • আব্বাসীয় খিলাফতের বিরুদ্ধে একাধিক বিদ্রোহ সংগঠিত হয়, যেমন: খারিজি ও শিয়া বিদ্রোহ, যা শাসন ব্যবস্থাকে দুর্বল করে তোলে।

৩. তুর্কি সামরিক শক্তির উত্থান

  • আব্বাসীয় খলিফারা তুর্কি দাস সৈন্যদের (মামলুক) ব্যবহার করতেন, কিন্তু পরবর্তীকালে তারাই ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করে।

৪. অর্থনৈতিক দুর্বলতা

  • কর ব্যবস্থার দুর্বলতা ও অপ্রয়োজনীয় ব্যয়ের ফলে অর্থনৈতিক সংকট সৃষ্টি হয়।

৫. প্রশাসনিক দুর্নীতি

  • প্রশাসনের দুর্নীতি বৃদ্ধি পায়, যার ফলে শাসন ব্যবস্থা দুর্বল হয়ে পড়ে।

৬. মঙ্গোল আক্রমণ

  • ১২৫৮ সালে চেঙ্গিস খানের পৌত্র হালাকু খান বাগদাদ আক্রমণ করে আব্বাসীয় খিলাফতের পতন ঘটায়।

৭. সামরিক দুর্বলতা

  • সামরিক শক্তির অভাবে আব্বাসীয়রা নিজেদের প্রতিরক্ষা করতে ব্যর্থ হয়।

৮. বিভক্তি ও আঞ্চলিক শাসকদের উত্থান

  • স্পেনের কর্ডোভা, মিসরের ফাতেমীয় ও পারস্যের বুইয়িদ রাজবংশ আলাদা আলাদা সাম্রাজ্য গড়ে তোলে।

৯. বৈজ্ঞানিক ও প্রযুক্তিগত স্থবিরতা

  • আব্বাসীয়রা একসময় বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির পৃষ্ঠপোষকতা করলেও পরবর্তীকালে এর প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলে।

১০. সুন্নি-শিয়া সংঘাত

  • সুন্নি-শিয়া বিভক্তি আব্বাসীয় শাসনকে দুর্বল করে তোলে।

১১. ব্যয়বহুল জীবনযাত্রা

  • খলিফারা বিলাসী জীবনযাত্রায় অভ্যস্ত হয়ে পড়েন, যার ফলে তারা প্রশাসনের প্রতি উদাসীন হয়ে ওঠেন।

১২. প্রশাসনিক কেন্দ্রের দুর্বলতা

  • প্রাদেশিক শাসকরা খলিফার প্রতি আনুগত্য কমিয়ে দেন, ফলে খলিফার ক্ষমতা ক্ষীণ হয়ে যায়।

১৩. জনগণের অসন্তোষ

  • করের বোঝা, প্রশাসনিক দুর্নীতি ও অনৈতিক কার্যকলাপের কারণে জনগণ অসন্তুষ্ট হয়।

১৪. ইউরোপীয়দের ক্রুসেড আক্রমণ

  • ক্রুসেডের ফলে মুসলিম বিশ্বের শক্তি ক্ষয়প্রাপ্ত হয়, যা আব্বাসীয়দের দুর্বল করে ফেলে।

১৫. তাতারদের ধ্বংসযজ্ঞ

  • ১২৫৮ সালে মঙ্গোলদের হাতে বাগদাদের পতন ঘটে, যা আব্বাসীয় খিলাফতের চূড়ান্ত পরিণতি নির্ধারণ করে।

উপসংহার

আব্বাসীয় খিলাফত ইসলামের ইতিহাসে এক স্বর্ণযুগের সূচনা করেছিল, কিন্তু অভ্যন্তরীণ ও বাহ্যিক নানা কারণে তারা তাদের ক্ষমতা ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। “আব্বাসীয় কারা? আব্বাসীয় বংশের পতনের কারণসমূহ” এই আলোচনায় আমরা দেখতে পাই যে, রাজনৈতিক দুর্বলতা, অর্থনৈতিক সংকট, সামরিক ব্যর্থতা ও মঙ্গোলদের আক্রমণ তাদের পতনের মূল কারণ ছিল। ইসলামের ইতিহাসে এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা, যা ভবিষ্যৎ শাসকদের জন্য সতর্কবার্তা হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।

join our Degree suggestion Facebook group

Degree 1st Year Suggestion

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *