সেলজুক কারা? সেলজুকদের উত্থান ও পতনের ইতহাস লেখ।

সেলজুকদের উত্থান ও পতনঃ সেলজুক সাম্রাজ্য মুসলিম ইতিহাসের একটি গৌরবময়…

সেলজুকদের উত্থান ও পতনঃ

সেলজুক সাম্রাজ্য মুসলিম ইতিহাসের একটি গৌরবময় অধ্যায়, যা ১০৩৭ থেকে ১১৯৪ সাল পর্যন্ত বিস্তৃত ছিল।তাদের উত্থান ও পতনের ইতিহাস জেনে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে একটি যাযাবর তুর্কি গোত্র বিশাল সাম্রাজ্যে পরিণত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে কিভাবে তাদের পতন ঘটেছিল।

join our Degree suggestion Facebook group

Degree 1st Year Suggestion

সেলজুক কারা?

সেলজুকরা ছিল অঘুজ তুর্কি গোত্রের একটি উপগোত্র, যারা মূলত মধ্য এশিয়ার স্টেপ অঞ্চলে বসবাস করত। তাদের প্রতিষ্ঠাতা সেলজুক গাজী, যিনি ১০ম শতাব্দীতে ইসলাম গ্রহণ করেন এবং তার বংশধররা পরবর্তীতে সেলজুক সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন।তাদের সামরিক দক্ষতা এবং ইসলামিক সংস্কৃতির সাথে সংযোগ তাদেরকে মুসলিম বিশ্বের একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তিতে পরিণত করে।

সেলজুকদের উত্থান

১. ইসলাম গ্রহণ: ১০ম শতাব্দীতে সেলজুক গাজী ইসলাম গ্রহণ করেন, যা তাদেরকে মুসলিম বিশ্বের সাথে সংযুক্ত করে এবং তাদের সামরিক ও রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধিতে সহায়তা করে।

২. তুঘরিল বেগের নেতৃত্ব: সেলজুক গাজীর নাতি তুঘরিল বেগ ১০৩৭ সালে সেলজুক সাম্রাজ্যের প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি গজনভীদের পরাজিত করে খোরাসান দখল করেন এবং পরবর্তীতে বাগদাদে আব্বাসীয় খলিফার সমর্থন লাভ করেন।

৩. আল্প আরসালানের বিজয়: তুঘরিল বেগের উত্তরসূরি আল্প আরসালান ১০৭১ সালে মানজিকের্তের যুদ্ধে বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যকে পরাজিত করেন, যা আনাতোলিয়ায় তুর্কি প্রভাব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।

৪. মালিক শাহের শাসন: আল্প আরসালানের পুত্র মালিক শাহের শাসনামলে (১০৭২-১০৯২) সেলজুক সাম্রাজ্য তার সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছে। তিনি প্রশাসনিক সংস্কার ও অবকাঠামো উন্নয়নে মনোনিবেশ করেন।

৫. নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা: মালিক শাহের উজির নিযাম আল-মুলক বাগদাদে নিযামিয়া মাদ্রাসা প্রতিষ্ঠা করেন, যা ইসলামিক শিক্ষার কেন্দ্র হিসেবে পরিচিতি লাভ করে।

৬. সাংস্কৃতিক বিকাশ: সেলজুকদের শাসনামলে স্থাপত্য, শিল্পকলা এবং সাহিত্য ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য উন্নতি হয়। ইস্ফাহানের জামে মসজিদ তাদের স্থাপত্য কীর্তির একটি উদাহরণ।

৭. ইক্তা ব্যবস্থা: সামরিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য সেলজুকরা ইক্তা ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন, যেখানে জমির কর থেকে প্রাপ্ত আয় সামরিক কর্মকর্তাদের প্রদান করা হতো।

৮. বাইজেন্টাইনের সাথে সম্পর্ক: সেলজুকদের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্যের সাথে সংঘর্ষ এবং পরবর্তীতে সম্পর্ক স্থাপন তাদের পশ্চিম সীমান্তে স্থিতিশীলতা বজায় রাখতে সহায়তা করে।

৯. ক্রুসেডারদের সাথে সংঘর্ষ: প্রথম ক্রুসেড (১০৯৬-১০৯৯) চলাকালে সেলজুকরা ক্রুসেডারদের সাথে সংঘর্ষে লিপ্ত হয় এবং জেরুজালেম হারায়, যা তাদের সাম্রাজ্যের স্থিতিশীলতায় প্রভাব ফেলে।

১০. আহমেদ সাঞ্জারের শাসন: মালিক শাহের মৃত্যুর পর তার পুত্র আহমেদ সাঞ্জার পূর্ব সেলজুক সাম্রাজ্যের শাসন গ্রহণ করেন এবং ১১১৮ থেকে ১১৫৭ সাল পর্যন্ত শাসন করেন। তার শাসনামলে সাম্রাজ্য কিছু স্থিতিশীলতা বজায় রাখে।

সেলজুকদের পতন

১১. অভ্যন্তরীণ কোন্দল: মালিক শাহের মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদের মধ্যে ক্ষমতার লড়াই শুরু হয়, যা সাম্রাজ্যের অভ্যন্তরীণ স্থিতিশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১২. মঙ্গোল আক্রমণ: ১৩শ শতাব্দীতে মঙ্গোলদের আক্রমণ সেলজুক সাম্রাজ্যের পতনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। চেঙ্গিস খানের নেতৃত্বে মঙ্গোল বাহিনী সেলজুকদের পূর্বাঞ্চলীয় প্রদেশগুলো দখল করে।

১৩. আনাতোলিয়ায় বেয়লিকগুলোর উত্থান: সাম্রাজ্যের পশ্চিমাঞ্চলে ছোট ছোট তুর্কি বেয়লিক (স্বাধীন রাজ্য) গড়ে ওঠে, যা সেলজুকদের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণকে দুর্বল করে।

১৪. অর্থনৈতিক দুর্বলতা: ট্রেড রুটের নিয়ন্ত্রণ হারানো এবং অভ্যন্তরীণ কর ব্যবস্থার দুর্বলতা সাম্রাজ্যের অর্থনীতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

১৫. সামরিক শক্তির হ্রাস: অভ্যন্তরীণ কোন্দল এবং বহিরাগত আক্রমণের ফলে সেলজুকদের সামরিক শক্তি হ্রাস পায়, যা তাদের পতনকে ত্বরান্বিত করে।

সেলজুক সাম্রাজ্যের উত্থান ও পতনের ইতিহাস থেকে আমরা বুঝতে পারি কিভাবে একটি যাযাবর তুর্কি গোত্র ইসলামী বিশ্বের একটি প্রধান শক্তিতে পরিণত হয়েছিল এবং পরবর্তীতে অভ্যন্তরীণ ও বহিরাগত চ্যালেঞ্জের মুখে তাদের পতন ঘটে।

সেলজুকদের উত্থান ও পতনঃ

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *