শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের বিবরণ

শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের বিবরণ মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে শাহজাহানের…

শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের বিবরণ

মোগল সাম্রাজ্যের ইতিহাসে শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সম্রাট শাহজাহান ছিলেন মোগল সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগের অন্যতম সেরা শাসক। তবে তার মৃত্যুর পূর্বেই তার পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার নিয়ে ভয়াবহ লড়াই শুরু হয়, যা মোগল ইতিহাসের মোড় ঘুরিয়ে দেয়।

রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২য় পত্র এর উত্তর

Degree suggestion Facebook group

উত্তরাধিকার দ্বন্দ্বের কারণ

শাহজাহানের মৃত্যুর পর কে হবেন পরবর্তী সম্রাট, তা নিয়ে তার পুত্রদের মধ্যে এক রক্তক্ষয়ী লড়াই শুরু হয়। প্রধান কারণগুলো ছিল—

  1. সিংহাসনের প্রতি আকর্ষণ: শাহজাহানের চার পুত্র—দারা শিকোহ, আওরঙ্গজেব, সুজা ও মুরাদ প্রত্যেকেই সিংহাসন লাভের আশায় ছিলেন।
  2. শাহজাহানের অসুস্থতা: ১৬৫৭ সালে শাহজাহান গুরুতর অসুস্থ হয়ে পড়েন, ফলে তার উত্তরাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা তৈরি হয়।
  3. ক্ষমতার কেন্দ্রীকরণ: মোগল সাম্রাজ্যের প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী যোগ্যতম পুত্র সিংহাসনে বসার সুযোগ পেতেন, তাই প্রত্যেকেই নিজেদের যোগ্য প্রমাণের চেষ্টা করেন।
  4. ধর্মীয় ও রাজনৈতিক মতপার্থক্য: দারা শিকোহ ছিলেন উদার এবং ধর্মীয় সহনশীল, অন্যদিকে আওরঙ্গজেব ছিলেন কট্টরপন্থী মুসলিম, যা দ্বন্দ্ব আরও তীব্র করে তোলে।
  5. সামরিক শক্তির প্রতিযোগিতা: প্রত্যেক রাজপুত্রের নিজস্ব সেনাবাহিনী ছিল এবং তারা নিজেদের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য যুদ্ধ করতে প্রস্তুত ছিলেন।

প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী ও তাদের কৌশল

১. দারা শিকোহ

দারা শিকোহ ছিলেন শাহজাহানের সবচেয়ে বড় ছেলে এবং তার প্রিয় সন্তান। তিনি একজন সংস্কৃতজ্ঞ, কবি এবং ধর্মীয় সহিষ্ণুতার প্রতীক ছিলেন। শাহজাহান তাকে তার উত্তরসূরি করতে চেয়েছিলেন, তবে তার রাজনৈতিক কৌশল তুলনামূলক দুর্বল ছিল।

২. আওরঙ্গজেব

আওরঙ্গজেব ছিলেন ধর্মীয়ভাবে রক্ষণশীল এবং অত্যন্ত চতুর সেনাপতি। তিনি রাজনৈতিক কৌশল ও সামরিক শক্তির মাধ্যমে নিজের অবস্থান শক্তিশালী করেন।

৩. সুজা ও মুরাদ

সুজা বাংলা এবং মুরাদ গুজরাটের শাসনকর্তা ছিলেন। তারা প্রথমদিকে দারা শিকোহের বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে আওরঙ্গজেবের শত্রু হয়ে ওঠেন।

উত্তরাধিকার যুদ্ধের প্রধান ধাপ

  1. ধর্মত যুদ্ধ (১৬৫৮): দারা শিকোহ ও আওরঙ্গজেবের মধ্যে প্রথম বড় যুদ্ধ ধর্মতের ময়দানে হয়, যেখানে আওরঙ্গজেব জয়ী হন।
  2. সমুগড় যুদ্ধ: আওরঙ্গজেবের সেনাবাহিনী দারা শিকোহের বাহিনীকে পরাজিত করে এবং দারাকে পালিয়ে যেতে বাধ্য করে।
  3. খাজওয়া যুদ্ধ: সুজার সঙ্গে সংঘর্ষে আওরঙ্গজেব বিজয়ী হন, যার ফলে সুজা অরাকানে পালিয়ে যান।
  4. মুরাদের বন্দিত্ব: আওরঙ্গজেব কৌশলে মুরাদকে বন্দি করে এবং তাকে মৃত্যুদণ্ড দেয়।
  5. দারা শিকোহের মৃত্যু: দারা শিকোহ পালিয়ে গেলেও শেষ পর্যন্ত তাকে গ্রেফতার করে হত্যা করা হয়।
  6. শাহজাহানের বন্দিত্ব: আওরঙ্গজেব নিজের বাবাকে আগ্রার দুর্গে বন্দি করেন এবং ১৬৬৬ সালে শাহজাহান মৃত্যুবরণ করেন।

উত্তরাধিকার যুদ্ধের ফলাফল

  1. আওরঙ্গজেবের রাজত্ব প্রতিষ্ঠা: ১৬৫৮ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মোগল সম্রাট হিসেবে সিংহাসনে বসেন।
  2. মোগল সাম্রাজ্যের পরিবর্তন: মোগল সাম্রাজ্য আরও রক্ষণশীল হয়ে ওঠে, কারণ আওরঙ্গজেব কট্টর ইসলামী নীতি অনুসরণ করেন।
  3. রাজনৈতিক অস্থিরতা: এই যুদ্ধের ফলে সাম্রাজ্যের অর্থনৈতিক ও সামরিক শক্তি দুর্বল হয়ে পড়ে।
  4. দক্ষিণ ভারত অভিযান: আওরঙ্গজেব তার অধিকাংশ সময় দক্ষিণ ভারত জয়ের জন্য ব্যয় করেন, যা মোগল সাম্রাজ্যের ওপর অতিরিক্ত চাপ সৃষ্টি করে।
  5. ভবিষ্যৎ মোগল সাম্রাজ্যের পতনের বীজ: এই যুদ্ধ মোগল সাম্রাজ্যের ভেতরকার দুর্বলতাগুলোকে উন্মোচিত করে, যা পরবর্তী সময়ে ব্রিটিশদের জন্য সুবিধাজনক হয়ে ওঠে।

উপসংহার

শাহজাহানের পুত্রদের মধ্যে উত্তরাধিকার দ্বন্দ্ব কেবল একটি পারিবারিক কলহ ছিল না, এটি ছিল মোগল সাম্রাজ্যের এক যুগান্তকারী ঘটনা। দারা শিকোহের পরাজয় ও আওরঙ্গজেবের উত্থান মোগল শাসনের চরিত্র পাল্টে দেয় এবং সাম্রাজ্যের ভবিষ্যৎ দুর্বল করে ফেলে। এই দ্বন্দ্ব মোগল সাম্রাজ্যের পতনের অন্যতম প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

এই বিশ্লেষণ থেকে বোঝা যায়, উত্তরাধিকার নিয়ে সংঘর্ষ শুধু ব্যক্তিগত বা পারিবারিক ব্যাপার নয়, এটি একটি সাম্রাজ্যের ভাগ্য নির্ধারণেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে পারে।

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *