মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর ভূমিকা মুঘল…
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে আলোচনা কর
ভূমিকা
মুঘল সাম্রাজ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যতম শক্তিশালী সাম্রাজ্য, যা প্রায় ৩৩০ বছর (১৫২৬-১৮৫৭) ধরে টিকে ছিল। এই সাম্রাজ্যের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত সুগঠিত ও সংগঠিত ছিল, যা মুঘল শাসকদের দীর্ঘ শাসন পরিচালনার মূল ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল। এ নিবন্ধে আমরা মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করবো।
রাষ্ট্রবিজ্ঞান ২য় পত্র এর উত্তর
Degree suggestion Facebook group
১. মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার মূল কাঠামো
মুঘল শাসন ব্যবস্থাটি ছিল একটি কেন্দ্রীভূত সাম্রাজ্য যেখানে সম্রাটের ক্ষমতা সর্বোচ্চ ছিল। প্রশাসনিক কাঠামোতে বিভিন্ন স্তরের কর্মকর্তা এবং পরিষদ অন্তর্ভুক্ত ছিল।
২. সম্রাটের সর্বময় ক্ষমতা
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থার প্রধান বৈশিষ্ট্য ছিল সম্রাটের সর্বময় ক্ষমতা। তিনি আইন প্রণয়ন, বিচার, যুদ্ধ পরিচালনা এবং রাজস্ব সংগ্রহসহ সব বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতেন।
৩. দেওয়ানী ও সামরিক প্রশাসন
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা দুটি প্রধান শাখায় বিভক্ত ছিল— দেওয়ানী (নাগরিক) ও সামরিক প্রশাসন। দেওয়ানী শাসন পরিচালনায় প্রধান ছিলেন ‘ওয়াজির’ বা প্রধান মন্ত্রী। অন্যদিকে, সামরিক প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্বে ছিলেন মীর বখশি।
৪. আমীর-উল-উমরা ও মীর বখশি
আমীর-উল-উমরা ছিলেন সামরিক ও প্রশাসনিক প্রধানদের একজন, যিনি সম্রাটকে পরামর্শ দিতেন। মীর বখশি সাম্রাজ্যের সামরিক কার্যক্রম তদারকি করতেন।
৫. দেওয়ান-ই-আলা
দেওয়ান-ই-আলা ছিলেন অর্থ ও রাজস্ব বিভাগের প্রধান কর্মকর্তা, যিনি রাজস্ব সংগ্রহ, ব্যয় ও হিসাব-নিকাশের দায়িত্ব পালন করতেন।
৬. কোটওয়াল ব্যবস্থা
রাজধানী এবং প্রধান শহরগুলোর নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষার জন্য কোটওয়াল নিয়োগ করা হতো। তিনি পুলিশ প্রশাসন পরিচালনার দায়িত্ব পালন করতেন।
৭. সুবাহ, সরকার ও পরগণা
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা তিনটি স্তরে বিভক্ত ছিল:
- সুবাহ (প্রদেশ) – সুবাহদার দ্বারা পরিচালিত
- সরকার (জেলা) – ফৌজদার ও আমিন দ্বারা পরিচালিত
- পরগণা (উপজেলা) – শিকদার ও মোকাদ্দম দ্বারা পরিচালিত
৮. মুঘল রাজস্ব ব্যবস্থা
রাজস্ব আদায়ের জন্য প্রধানত জায়গীরদারি ও জমিন্দারি ব্যবস্থা চালু ছিল। রাজস্ব আদায়ের দায়িত্ব দেওয়ানদের উপর ন্যস্ত ছিল।
৯. সেনাবাহিনীর সংগঠন
মুঘল সাম্রাজ্যের শক্তিশালী সেনাবাহিনী ছিল। এতে অশ্বারোহী, পদাতিক, গোলন্দাজ এবং নৌবাহিনী অন্তর্ভুক্ত ছিল।
১০. বিচার ব্যবস্থা
মুঘল আমলের বিচার ব্যবস্থা ধর্মীয় ও সাধারণ আইনের সমন্বয়ে পরিচালিত হতো। প্রধান বিচারপতি ছিলেন ক্বাজী-উল-ক্বুজাত।
১১. মুঘল প্রশাসনের ধর্মীয় নীতি
মুঘল শাসকরা সাধারণত ধর্মীয় সহনশীলতা দেখাতেন। আকবর তার ‘দীন-ই-ইলাহী’ মতবাদ প্রচার করেন, যা ধর্মীয় সাম্প্রদায়িকতার বাইরে ছিল।
১২. সংবাদ ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা
সম্রাটকে সাম্রাজ্যের সার্বিক পরিস্থিতি জানাতে ডাক ও গোয়েন্দা ব্যবস্থা গড়ে তোলা হয়েছিল। এ জন্য বার্তাবাহক ও গুপ্তচর ব্যবস্থার প্রচলন ছিল।
১৩. জায়গীর ও মনসবদারি ব্যবস্থা
মনসবদারি ব্যবস্থা ছিল মুঘল আমলের প্রশাসনিক ভিত্তি। সম্রাট সেনাপতিদের মধ্যে বিভিন্ন পদমর্যাদা অনুযায়ী মনসব প্রদান করতেন।
১৪. প্রশাসনিক দক্ষতা
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা দক্ষতার সাথে পরিচালিত হতো। বিভিন্ন বিভাগ ও স্তরের সমন্বয়ে এই ব্যবস্থা কার্যকর ছিল।
১৫. পতনের কারণ
যদিও মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা অত্যন্ত শক্তিশালী ছিল, কিন্তু দুর্নীতি, দুর্বল শাসক, ব্রিটিশ আগ্রাসন এবং আভ্যন্তরীণ বিদ্রোহের কারণে এটি ধ্বংস হয়ে যায়।
উপসংহার
মুঘল আমলের কেন্দ্রীয় শাসন ব্যবস্থা ছিল অত্যন্ত সংগঠিত ও কার্যকরী। এটি ভারতীয় উপমহাদেশের ইতিহাসে গভীর প্রভাব ফেলেছে। বর্তমান প্রশাসনিক ব্যবস্থার অনেক উপাদান মুঘল প্রশাসন থেকে গৃহীত হয়েছে।