মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা সংক্ষেপে লেখ।
মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা সংক্ষেপে লেখ। স্বাধীন বাংলা…
মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের ভূমিকা সংক্ষেপে লেখ।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (Shwadhin Bangla Betar Kendra) বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধ ১৯৭১-এর ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় অধ্যায়। এটি ছিল শুধুমাত্র একটি সম্প্রচার মাধ্যম নয়, বরং যুদ্ধের দ্বিতীয় ফ্রন্ট এবং বাঙালি জাতির আশা-আকাঙ্ক্ষার বাণী বাহক। নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম চলাকালীন সময়ে এই বেতার কেন্দ্রটি যুদ্ধাহত ও সাধারণ মানুষের মনোবলকে উদ্দীপ্ত করতে এবং বিশ্ব জনমত গঠনে এক অতুলনীয় ভূমিকা পালন করেছিল। এটি ছিল পাকিস্তানি সামরিক জান্তার ভয়াবহ মিথ্যাচারের বিরুদ্ধে বাঙালির সত্যের কণ্ঠস্বর।
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের মূল ভূমিকা
মুক্তিযুদ্ধে স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অবদান সংক্ষেপে তুলে ধরা হলো:
১. স্বাধীনতার ঘোষণা ও দিকনির্দেশনা প্রচার: * ২৬ মার্চ ১৯৭১ চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের পক্ষে স্বাধীনতার ঘোষণা প্রচারের মাধ্যমে এই কেন্দ্রের আনুষ্ঠানিক যাত্রা শুরু হয়। * মুক্তিযুদ্ধকালীন প্রবাসী সরকারের (মুজিবনগর সরকার) সকল বক্তব্য, বিবৃতি, এবং রণাঙ্গনের দিকনির্দেশনা নিয়মিতভাবে প্রচার করে এটি জাতিকে সুসংগঠিত করতে সাহায্য করে।
২. মনোবল বৃদ্ধি ও মানসিক যুদ্ধ পরিচালনা (Psychological Warfare): * এই কেন্দ্র থেকে প্রচারিত দেশাত্মবোধক গান, কবিতা, নাটক ও কথিকাগুলো ছিল মুক্তিকামী বাঙালি এবং মুক্তিযোদ্ধাদের কাছে আশার মশাল। * বিশেষ করে, ‘জয় বাংলা, বাংলার জয়’ গানটি ছিল অনুপ্রেরণার মূলমন্ত্র, যা সৈন্যদের হৃদয়ে সাহস ও প্রতিরোধের স্পৃহা যুগিয়েছে।
৩. পাকিস্তানি অপপ্রচারের বিরুদ্ধে সত্য প্রকাশ: * পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী রেডিও পাকিস্তান থেকে বাঙালি জাতির বিরুদ্ধে যে মিথ্যাচার ও অপপ্রচার চালাতো, স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র ছিল তার শক্তিশালী জবাব। * এটি নিয়মিতভাবে যুদ্ধের সঠিক সংবাদ ও রণাঙ্গনের সাফল্যের কাহিনি প্রচার করে জাতিকে ঐক্যবদ্ধ রাখে।
৪. জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক বিপ্লব: * বেতার কেন্দ্রের দুটি অত্যন্ত জনপ্রিয় অনুষ্ঠান ছিল ‘চরমপত্র’ (লেখক ও উপস্থাপক: এম. আর. আখতার মুকুল) এবং ‘জল্লাদের দরবার’। * ঢাকাইয়া উপভাষায় রচিত ‘চরমপত্র’ একদিকে যেমন তীব্র ব্যঙ্গ ও কৌতুক দিয়ে হানাদারদের ভীতসন্ত্রস্ত করতো, তেমনি অন্যদিকে বাঙালির মনে আত্মবিশ্বাস ও বিজয়ের আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতো।
৫. আন্তর্জাতিক জনমত গঠন: * বেতার কেন্দ্রটি বাংলা ছাড়াও ইংরেজি এবং উর্দুতে সংবাদ সম্প্রচার করত। * এর মাধ্যমে পাকিস্তানি বর্বরতা ও গণহত্যার প্রকৃত চিত্র সারা বিশ্বে তুলে ধরা হয়। ফলস্বরূপ, এটি বিশ্বের বিভিন্ন দেশের মানুষের সহানুভূতি এবং সমর্থন আদায়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে, যা বাংলাদেশের স্বাধীনতা ও বৈধতা সম্পর্কে আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি করে।
উপসংহার
স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র (এসবিসি) নিঃসন্দেহে মহান মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি উজ্জ্বল নাম। এর শব্দসৈনিকরা অস্ত্র হাতে যুদ্ধ না করেও তাদের কণ্ঠ ও লেখনীর মাধ্যমে যে মনস্তাত্ত্বিক যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন, তা সশস্ত্র সংগ্রামের চেয়ে কোনো অংশে কম গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। তাই এটি শুধু একটি প্রচারমাধ্যম ছিল না, বরং ছিল মুক্তিযুদ্ধের অনিবার্য কণ্ঠস্বর এবং স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের অন্যতম শক্তিশালী স্তম্ভ।



