পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো আলোচনা কর।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো আলোচনা কর। পূর্ব পাকিস্তানের…

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো আলোচনা কর।

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মূল ভিত্তি স্থাপন করেছিল। ১৯৪৭ সালে দ্বি-জাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে পাকিস্তান গঠিত হলেও, এর দুটি অংশের মধ্যে দূরত্ব ভৌগোলিক সীমানাকে ছাড়িয়ে অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছিল। পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী সুপরিকল্পিতভাবে পূর্ব পাকিস্তানকে একটি উপনিবেশ হিসেবে গণ্য করে চরম শোষণ ও বঞ্চনার শিকার করেছিল। এই সুদীর্ঘ বৈষম্যের ইতিহাসই বাঙালি জাতীয়তাবাদের জন্ম দেয় এবং ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমে স্বাধীন সার্বভৌম বাংলাদেশের পথ প্রশস্ত করে। এটি কেবল ইতিহাসের একটি অধ্যায় নয়, বরং একটি স্বাধীন জাতিরাষ্ট্রের জন্মবেদনার জ্বলন্ত দলিল, যা প্রতিটি বাঙালির হৃদয়ে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর করুণ চিত্র বহন করে।

নিচে পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর গুরুত্বপূর্ণ দিক বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো:

১. অর্থনৈতিক বৈষম্য (Economic Disparity)

পূর্ব পাকিস্তান দেশের মোট আয়ের একটি বড় অংশ (বিশেষত পাট রপ্তানির মাধ্যমে) অর্জন করলেও, কেন্দ্রীয় সরকার সেই আয়ের সিংহভাগ পশ্চিম পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করত। ১৯৫০ থেকে ১৯৭০ সালের মধ্যে পূর্ব পাকিস্তানে মোট কেন্দ্রীয় বিনিয়োগের পরিমাণ ছিল মাত্র ২৫% থেকে ৩০%, যেখানে পশ্চিম পাকিস্তানে তা ছিল ৭০% থেকে ৭৫%। এই অর্থনৈতিক শোষণ পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর মধ্যে অন্যতম প্রধান কারণ ছিল।

২. প্রশাসনিক ও সামরিক বৈষম্য (Administrative and Military Disparity)

কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চপদস্থ সামরিক ও বেসামরিক পদগুলোতে পশ্চিম পাকিস্তানিরাই একচেটিয়াভাবে প্রাধান্য বিস্তার করত। সিভিল সার্ভিসেস (CSP) থেকে শুরু করে সামরিক বাহিনী, পররাষ্ট্র দপ্তর—সর্বত্রই বাঙালির প্রতিনিধিত্ব ছিল নগণ্য। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৬৬ সাল পর্যন্ত ১৭ জন শীর্ষ সামরিক কর্মকর্তার মধ্যে মাত্র একজন ছিলেন বাঙালি। এর ফলে নীতি নির্ধারণ এবং তা বাস্তবায়নে পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের স্বার্থ উপেক্ষিত হতো।

৩. বাজেটে বরাদ্দ বৈষম্য (Budget Allocation Disparity)

জাতীয় বাজেটের সিংহভাগ, বিশেষত সামরিক খাতে, পশ্চিম পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ করা হতো। পূর্ব পাকিস্তান বেশি রাজস্ব আয় করা সত্ত্বেও সামরিক ও বেসামরিক উভয় খাতেই পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় অনেক কম অংশ পেত। এটি পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর অর্থনৈতিক কাঠামোকে আরও শক্তিশালী করেছিল।

৪. বৈদেশিক সাহায্য ব্যবহারে বৈষম্য (Disparity in Utilizing Foreign Aid)

আন্তর্জাতিক সাহায্য ও ঋণ গ্রহণের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তানকে অগ্রাধিকার দেওয়া হতো। গৃহীত বৈদেশিক সাহায্যের একটি বড় অংশ পশ্চিম পাকিস্তানের শিল্পায়ন ও অবকাঠামো উন্নয়নে ব্যবহৃত হলেও, পূর্ব পাকিস্তানের জন্য বরাদ্দ ছিল অপ্রতুল।

৫. ভাষাগত বৈষম্য (Linguistic Discrimination)

পাকিস্তানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষের ভাষা বাংলা হওয়া সত্ত্বেও, ১৯৪৭ সালেই উর্দুকে একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার ঘোষণা দেওয়া হয়। এটি ছিল বাঙালির ভাষা ও সংস্কৃতির উপর প্রথম আঘাত। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের মাধ্যমে বাঙালিরা ভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠা করলেও, পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর মানসিকতায় ভাষাগত বৈষম্য বজায় ছিল। এই ভাষাগত দ্বন্দ্ব পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর সাংস্কৃতিক ভিত্তিকে মজবুত করেছিল।

৬. সাংস্কৃতিক নিপীড়ন (Cultural Repression)

ভাষার পাশাপাশি বাঙালির সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যকে ধ্বংস করার জন্য নানাবিধ চেষ্টা চালানো হয়। রবীন্দ্রসংগীত প্রচার বন্ধ করা, বাংলা বর্ণমালা পরিবর্তনের উদ্যোগ এবং পহেলা বৈশাখের মতো ঐতিহ্যবাহী উৎসব পালনে বাধা প্রদান করা ছিল এই সাংস্কৃতিক নিপীড়নের অংশ।

৭. শিক্ষা খাতে বৈষম্য (Disparity in Education Sector)

শিক্ষা প্রতিষ্ঠান নির্মাণ, উচ্চশিক্ষা ও গবেষণার জন্য আর্থিক বরাদ্দ এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রে পশ্চিম পাকিস্তান সবসময় এগিয়ে ছিল। তুলনামূলকভাবে পূর্ব পাকিস্তানে স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা এবং মান ছিল নিম্ন। শিক্ষা ক্ষেত্রে এই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো বাঙালির অগ্রযাত্রাকে বাধাগ্রস্ত করে।

৮. স্বাস্থ্য খাতে বৈষম্য (Disparity in Health Sector)

হাসপাতাল, চিকিৎসা কেন্দ্র স্থাপন, ডাক্তার ও নার্স নিয়োগ এবং স্বাস্থ্য গবেষণার ক্ষেত্রেও মারাত্মক বৈষম্য ছিল। পূর্ব পাকিস্তানের সাধারণ মানুষ উন্নত চিকিৎসাসেবা থেকে বঞ্চিত হতো।

৯. যোগাযোগ ও অবকাঠামো বৈষম্য (Communication and Infrastructure Disparity)

সড়ক, রেল, বন্দর ও বিমান যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নয়নে পশ্চিম পাকিস্তানে ব্যাপক বিনিয়োগ করা হলেও, পূর্ব পাকিস্তানের যোগাযোগ অবকাঠামো ছিল খুবই দুর্বল। এই বৈষম্য পূর্ব পাকিস্তানের অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডকেও প্রভাবিত করে।

১০. শিল্প ও বাণিজ্যে বৈষম্য (Disparity in Industry and Commerce)

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের প্রধান কার্যালয়, বীমা কোম্পানি, শিল্প ব্যাংক ও বড় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠানের সদর দপ্তরগুলো পশ্চিম পাকিস্তানে স্থাপন করা হয়। এর ফলে বাঙালি শিল্পোদ্যোক্তারা ঋণ ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা লাভে বঞ্চিত হন। এমনকি পূর্ব পাকিস্তানের পাট শিল্পের প্রধান শিল্পকেন্দ্রও পশ্চিম পাকিস্তানে স্থানান্তরিত হয়।

১১. বৈদেশিক মুদ্রা অর্জনে বৈষম্য (Disparity in Foreign Exchange Earning)

পূর্ব পাকিস্তান পাট ও চামড়া রপ্তানির মাধ্যমে দেশের মোট বৈদেশিক মুদ্রার একটি উল্লেখযোগ্য অংশ (প্রায় ৬০%) অর্জন করত, কিন্তু এর মাত্র ২০%-এর মতো অংশ পূর্ব পাকিস্তানের উন্নয়নে ব্যয় করা হতো। এই বৈষম্য এক প্রকার ‘অভ্যন্তরীণ উপনিবেশবাদ’-এর জন্ম দেয়।

১২. রাজনৈতিক অধিকার হরণ (Erosion of Political Rights)

পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ হওয়া সত্ত্বেও ক্ষমতা পশ্চিম পাকিস্তানের হাতেই কেন্দ্রীভূত ছিল। সামরিক শাসন জারি করে এবং নানা অজুহাতে গণতান্ত্রিক অধিকার খর্ব করে বাঙালিকে রাজনৈতিকভাবে প্রান্তিক করা হয়। ১৯৭০ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগের নিরঙ্কুশ জয়লাভ সত্ত্বেও ক্ষমতা হস্তান্তরে অস্বীকৃতিই ছিল এই বৈষম্যের চূড়ান্ত বহিঃপ্রকাশ।

১৩. চাকরির ক্ষেত্রে কোটা পদ্ধতি (Quota System in Jobs)

সরকারি চাকরিতে কোটা পদ্ধতির মাধ্যমে বাঙালিকে বঞ্চিত করা হতো। উচ্চতর সরকারি পদগুলিতে পশ্চিম পাকিস্তানিরা বিপুল সংখ্যায় নিয়োগ পেত, যা প্রশাসনিক ক্ষেত্রে বাঙালিদের দুর্বল করে তুলেছিল।

১৪. প্রাকৃতিক দুর্যোগে উদাসীনতা (Indifference to Natural Disasters)

পূর্ব পাকিস্তান প্রায়শই বন্যা ও ঘূর্ণিঝড়ের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগের শিকার হতো। কেন্দ্রীয় সরকার এসব দুর্যোগ মোকাবিলায় চরম উদাসীনতা দেখাত এবং ত্রাণ কার্যক্রমে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিত না, যা মানবিক বৈষম্যের চরম রূপ।

১৫. গণমাধ্যমের নিয়ন্ত্রণ (Control over Mass Media)

রেডিও, টেলিভিশন এবং সংবাদপত্রসহ অন্যান্য গণমাধ্যমকে কেন্দ্রীয় সরকার কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করত। এসব গণমাধ্যমে পশ্চিম পাকিস্তানি সংস্কৃতি ও ভাষার প্রচার করা হতো এবং বাঙালির কণ্ঠস্বরকে দমিয়ে রাখা হতো।

উপসংহার

পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলোর দীর্ঘ ও নির্মম ইতিহাস স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের প্রধান চালিকাশক্তি ছিল। অর্থনৈতিক শোষণ, রাজনৈতিক বঞ্চনা, সাংস্কৃতিক নিপীড়ন এবং সামরিক ও প্রশাসনিক ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বৈষম্য—এগুলোই বাঙালিকে তাদের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব ও অধিকার সম্পর্কে সচেতন করে তোলে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ছয় দফা আন্দোলন থেকে শুরু করে একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধ পর্যন্ত প্রতিটি পদক্ষেপ ছিল এই বৈষম্যের বিরুদ্ধে সোচ্চার প্রতিবাদ।এই পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি পশ্চিম পাকিস্তানের বৈষম্যগুলো প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ের ভিত্তিতে একটি জাতিরাষ্ট্র টিকে থাকতে পারে না। একটি সফল জাতিরাষ্ট্রের জন্য প্রয়োজন পারস্পরিক সম্মান, অর্থনৈতিক সমতা এবং সকল নাগরিকের ন্যায্য অধিকারের স্বীকৃতি। এই বৈষম্যের ইতিহাসই বাঙালিকে তাদের আত্মমর্যাদা রক্ষার জন্য সর্বোচ্চ ত্যাগ স্বীকারে উদ্বুদ্ধ করেছিল এবং একটি স্বাধীন জাতি হিসেবে বিশ্ব মানচিত্রে তাদের স্থান করে নিতে সাহায্য করেছিল। এই ঐতিহাসিক বৈষম্যগুলোর গভীর উপলব্ধি, বাংলাদেশের বর্তমান ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে তাদের জাতীয় পরিচয় এবং স্বাধীনতা অর্জনের গুরুত্ব অনুধাবন করতে শেখাবে।

১ম বর্ষ ডিগ্রি সাজেশন ২০২৫

Download pdf

Join our Facebook Group

Similar Posts

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *