পলল কোণ ও পলল পাখা কি? পানির বিশ্ববিন্যাস দেখাও।
পলল কোণ ও পলল পাখা কি? পানির বিশ্ববিন্যাস দেখাও। পৃথিবীর…
পলল কোণ ও পলল পাখা কি? পানির বিশ্ববিন্যাস দেখাও।
পৃথিবীর ভূপৃষ্ঠে বিভিন্ন ভূমিরূপ গঠনের ক্ষেত্রে নদী, বাতাস, বরফ এবং সমুদ্রের তরঙ্গ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। নদী প্রবাহের ফলে সৃষ্ট পলল সঞ্চয় অনেক গুরুত্বপূর্ণ ভূমিরূপ তৈরি করে, যার মধ্যে অন্যতম হলো পলল কোণ (Alluvial Cone) এবং পলল পাখা (Alluvial Fan)। এদের গঠন, বৈশিষ্ট্য এবং ভূমিরূপ পরিবর্তনে তাদের ভূমিকা বিশদভাবে আলোচনা করা হবে।
Degree suggestion Facebook group
পলল কোণ ও পলল পাখা কি?
পলল কোণ (Alluvial Cone)
পলল কোণ হলো এমন একটি শঙ্কু আকৃতির ভূমিরূপ, যা পাহাড়ের ঢাল বা উচ্চভূমি থেকে নামা নদীর স্রোতের মাধ্যমে বয়ে আনা পলল পদার্থ জমা হওয়ার ফলে গঠিত হয়। এটি সাধারণত শুষ্ক বা আধা-শুষ্ক অঞ্চলে বেশি দেখা যায়।
পলল কোণের বৈশিষ্ট্য:
- শঙ্কু আকৃতির গঠন।
- বড় ও ভারী পলল কণা, যেমন নুড়ি, বোল্ডার এবং কাঁকর থাকে।
- ঢাল খাড়া হয় (প্রায় ১০°-২৫° পর্যন্ত)।
- নদীর স্রোতের গতিবেগ বেশি থাকে।
পলল পাখা (Alluvial Fan)
পলল পাখা হলো এমন একটি ভূমিরূপ, যা পলল কোণের তুলনায় অপেক্ষাকৃত কম ঢালবিশিষ্ট এবং পাখা আকৃতির হয়। এটি তখন গঠিত হয়, যখন পাহাড়ি নদী সমতলে প্রবাহিত হয়ে ধীরগতিতে পলল জমা করে।
পলল পাখার বৈশিষ্ট্য:
- পাখা আকৃতির গঠন।
- সূক্ষ্ম পলল কণা, যেমন বালি, কাদা ও পলিমাটি থাকে।
- ঢাল অপেক্ষাকৃত কম (প্রায় ৫°-১৫° পর্যন্ত)।
- নদীর স্রোতের গতিবেগ কম থাকে।
পলল কোণ ও পলল পাখার পার্থক্য
বৈশিষ্ট্য | পলল কোণ | পলল পাখা |
---|---|---|
আকৃতি | শঙ্কু আকৃতির | পাখা আকৃতির |
পলল কণার আকার | বড় ও ভারী (নুড়ি, কাঁকর) | সূক্ষ্ম ও হালকা (বালি, কাদা) |
ঢালের প্রবণতা | বেশি খাড়া | অপেক্ষাকৃত কম খাড়া |
স্রোতের গতি | বেশি | কম |
গঠনের স্থান | পাহাড়ি এলাকা | সমতলভূমির কিনারায় |
পলল কোণ ও পলল পাখার গঠন প্রক্রিয়া
পলল কোণ ও পলল পাখা সাধারণত নিচের ধাপে গঠিত হয়:
- নদীর প্রবাহ ও ভারী বৃষ্টিপাত: পাহাড় বা উচ্চভূমিতে বৃষ্টিপাত হলে পানি দ্রুত নিচের দিকে প্রবাহিত হয়।
- ক্ষয় প্রক্রিয়া: প্রবল স্রোতের কারণে নদী তার গতিপথে শিলা, কাঁকর, নুড়ি ও বালির কণা সংগ্রহ করে।
- পলল সঞ্চয়: নদী সমতল ভূমিতে প্রবেশ করলে স্রোতের গতি হ্রাস পায় এবং পলল পদার্থ জমা হতে শুরু করে।
- পলল কোণ গঠন: যদি পলল জমার হার বেশি হয় এবং স্থান সংকীর্ণ থাকে, তবে খাড়া ঢালের পলল কোণ গঠিত হয়।
- পলল পাখা গঠন: যদি নদী ধীরগতিতে বিস্তৃত স্থানে প্রবাহিত হয়, তবে পাখা আকৃতির পলল পাখা গঠিত হয়।
পানির বিশ্ববিন্যাস (Global Distribution of Water)
পৃথিবীর মোট পৃষ্ঠভাগের ৭১% অংশ জল দ্বারা আবৃত, যার অধিকাংশই সমুদ্র ও মহাসাগরে রয়েছে। তবে, পানির পরিমাণ ও ধরণ অনুযায়ী এর বন্টন বিভিন্নভাবে দেখা যায়।
পৃথিবীতে পানির মোট পরিমাণ ও বন্টন
পানির উৎস | মোট পানির শতকরা হার |
---|---|
সমুদ্র ও মহাসাগর | ৯৭.৫% |
মিঠা পানি (Fresh Water) | ২.৫% |
– বরফ ও হিমবাহ | ৬৮.৭% |
– ভূগর্ভস্থ পানি | ৩০.১% |
– নদী ও হ্রদের পানি | ০.৩% |
পানির উৎসসমূহের বিবরণ
- সমুদ্র ও মহাসাগর: পৃথিবীর অধিকাংশ পানি লবণাক্ত, যা পান করার উপযোগী নয়।
- বরফ ও হিমবাহ: পৃথিবীর মোট মিঠা পানির সবচেয়ে বড় অংশ এই উৎসে জমা রয়েছে, যা প্রধানত মেরু অঞ্চলে অবস্থিত।
- ভূগর্ভস্থ পানি: এটি ভূ-পৃষ্ঠের নিচে জমা থাকা পানি, যা কূপ, নলকূপ ও গভীর নলকূপের মাধ্যমে তোলা যায়।
- নদী ও হ্রদ: এগুলো ভূ-পৃষ্ঠের উন্মুক্ত মিঠা পানির উৎস, যা মানুষের সরাসরি ব্যবহারের জন্য অন্যতম প্রধান উৎস।
পানির বিশ্ববিন্যাসের প্রভাব
জলবায়ু ও আবহাওয়ার উপর প্রভাব
- সমুদ্র ও মহাসাগরের পানি বাষ্পীভবনের মাধ্যমে বায়ুমণ্ডলে আর্দ্রতা সরবরাহ করে, যা বৃষ্টি ও অন্যান্য আবহাওয়া পরিবর্তনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
- মেরু অঞ্চলের বরফ গলে গেলে সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি পায়, যা উপকূলীয় অঞ্চলের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
জীববৈচিত্র্য ও বাস্তুসংস্থান
- সমুদ্র, নদী ও হ্রদ জীববৈচিত্র্যের অন্যতম প্রধান আশ্রয়স্থল।
- পানির অভাব বা দূষণ জীবজগতের জন্য বড় হুমকি সৃষ্টি করতে পারে।
মানব সভ্যতা ও অর্থনীতি
- কৃষি, শিল্প ও গৃহস্থালির জন্য পানির সহজলভ্যতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
- বিশ্বজুড়ে অনেক অর্থনীতি মৎস্য চাষ, নৌপরিবহন ও পানিসম্পদ ব্যবস্থাপনার উপর নির্ভরশীল।
উপসংহার
পলল কোণ ও পলল পাখা পৃথিবীর ভূ-গঠনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ, যা পাহাড়ি অঞ্চলে নদীর সঞ্চিত পললের মাধ্যমে গঠিত হয়। এগুলো ভূমিরূপ পরিবর্তন, কৃষিকাজ ও বাস্তুসংস্থানের ওপর গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলে।
অন্যদিকে, পানির বিশ্ববিন্যাস মানব সভ্যতা ও পরিবেশের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পানির সঠিক ব্যবস্থাপনা ও সংরক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে, যাতে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানির প্রাপ্যতা বজায় থাকে।