দ্বি-জাতি তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা কর।
দ্বি-জাতি তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা কর দ্বি-জাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory) ছিল…
দ্বি-জাতি তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা কর
দ্বি-জাতি তত্ত্ব (Two-Nation Theory) ছিল ব্রিটিশ ভারতের হিন্দু ও মুসলমানদের দুটি স্বতন্ত্র জাতি হিসেবে চিহ্নিত করার একটি রাজনৈতিক মতবাদ। এই তত্ত্বের মূল ধারণা ছিল যে, ভারতীয় উপমহাদেশের এই দুই প্রধান জনগোষ্ঠী তাদের ধর্ম, সংস্কৃতি, ঐতিহ্য এবং জীবনযাত্রার ভিন্নতার কারণে এক রাষ্ট্রে শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান করতে পারে না। ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজন এবং পাকিস্তান রাষ্ট্রের জন্ম এই মতবাদের সরাসরি ফল। এই নিবন্ধে আমরা দ্বি-জাতি তত্ত্বের মূল বিষয়বস্তু ও এর তাৎপর্য নিয়ে আলোচনা করব।
দ্বি-জাতি তত্ত্বের প্রধান বৈশিষ্ট্য (The Core Tenets)
দ্বি-জাতি তত্ত্ব একটি ধর্মভিত্তিক জাতীয়তাবাদী মতাদর্শ যা ভারতীয় মুসলমানদের জন্য একটি পৃথক রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরেছিল। এই তত্ত্বের মূল যুক্তিগুলো নিম্নরূপ:
ধর্মই মূল নির্ধারক: এই তত্ত্বের প্রধান জোর ছিল ধর্মের ওপর। ভাষা, বর্ণ বা অন্যান্য সামাজিক বৈশিষ্ট্যের চেয়ে ধর্মকেই জাতীয়তার প্রধান ভিত্তি হিসেবে গণ্য করা হয়। মুসলিমরা একটি স্বতন্ত্র জাতি, কারণ তাদের জীবনধারা, বিশ্বাস এবং আইন হিন্দুদের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।
পৃথক সভ্যতা ও সংস্কৃতি: মুহাম্মদ আলী জিন্নাহর মতে, হিন্দু ও মুসলমানরা দুটি ভিন্ন ধর্মীয় দর্শন, সামাজিক রীতিনীতি, সাহিত্য ও ঐতিহ্য দ্বারা চালিত। তারা না আন্তঃবিবাহ করে, না একসাথে পানাহার করে এবং তারা দুটি সম্পূর্ণ ভিন্ন সভ্যতার অংশ।
রাজনৈতিক অসহায়ত্ব: এই তত্ত্বের প্রবক্তারা মনে করতেন যে, হিন্দু-সংখ্যাগরিষ্ঠ ভারতে মুসলমানরা চিরকাল রাজনৈতিকভাবে সংখ্যালঘু থেকে যাবে এবং তাদের স্বার্থ সুরক্ষিত হবে না। গণতান্ত্রিক কাঠামোতে তারা সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের দ্বারা শোষিত বা বৈষম্যের শিকার হতে পারে।
পৃথক রাষ্ট্রের দাবি: এই তত্ত্বের চূড়ান্ত লক্ষ্য ছিল ভারতীয় উপমহাদেশের মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ অঞ্চলগুলো নিয়ে একটি স্বতন্ত্র মুসলিম রাষ্ট্র বা হোমল্যান্ড প্রতিষ্ঠা করা। ১৯৪০ সালের লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে মুসলিম লীগ আনুষ্ঠানিকভাবে এই দাবি উত্থাপন করে।
ঐতিহাসিক ও সামাজিক পার্থক্য: স্যার সৈয়দ আহমদ খান এবং পরবর্তীতে স্যার মুহাম্মদ ইকবাল এই ধারণা দেন যে, ভারতের মুসলিম জনগোষ্ঠী ঐতিহাসিক, সাংস্কৃতিক ও সামাজিকভাবেই একটি পৃথক জাতিসত্তা গঠন করতে সক্ষম।
স্বাধীন মুসলিম জাতীয়তাবাদ: এই তত্ত্ব ভারতীয় মুসলমানদেরকে ভারতীয় জাতীয়তাবাদী আন্দোলন (বিশেষ করে কংগ্রেসের নেতৃত্বে পরিচালিত) থেকে নিজেদেরকে আলাদা করে, নিজস্ব মুসলিম জাতীয়তাবাদ বা মুসলিম জাতিসত্তা গড়ে তুলতে উৎসাহিত করে।
দ্বি-জাতি তত্ত্বের উন্মেষ ও প্রবক্তাগণ
স্যার সৈয়দ আহমদ খান (১৮১৭-১৮৯৮): তিনিই প্রথম ভারতীয় মুসলমানদেরকে কংগ্রেসের জাতীয়তাবাদী স্রোত থেকে দূরে থাকার এবং নিজেদের স্বার্থ রক্ষার্থে একটি পৃথক জাতি হিসেবে আত্মপরিচয়ের ধারণা দেন।
স্যার মুহাম্মদ ইকবাল (১৮৭৭-১৯৩৮): ১৯৩০ সালে সর্বভারতীয় মুসলিম লীগের অধিবেশনে সভাপতির ভাষণে তিনি দ্বি-জাতি তত্ত্বের তাত্ত্বিক কাঠামো উপস্থাপন করেন। তিনি মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রদেশগুলোকে একত্রিত করে একটি উত্তর-পশ্চিম ভারতীয় মুসলিম রাষ্ট্র গঠনের প্রস্তাব দেন।
মুহাম্মদ আলী জিন্নাহ (১৮৭৬-১৯৪৮): বিশ শতকের চল্লিশের দশকে তিনি এই ধারণার প্রধান উন্মেষকারী (Propounder) হিসেবে আবির্ভূত হন। ১৯৪০ সালে লাহোর প্রস্তাবের মাধ্যমে তিনি ঘোষণা করেন, “ভারতের সমস্যা দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে নয়, দুটি জাতির মধ্যে।” তাঁর নেতৃত্বেই এই তত্ত্ব পাকিস্তান আন্দোলনের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে।
তাৎপর্য ও ফলাফল
দ্বি-জাতি তত্ত্ব ১৯৪৭ সালে ভারত বিভাজনের মূল কারণ ছিল। এর ফলস্বরূপ ভারত (একটি ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র হিসেবে) এবং পাকিস্তান (একটি মুসলিম-সংখ্যাগরিষ্ঠ রাষ্ট্র হিসেবে) জন্ম নেয়। তবে, ১৯৭১ সালে পাকিস্তানের বিভাজন এবং বাংলাদেশ-এর উত্থান প্রমাণ করে যে শুধুমাত্র ধর্মীয় পরিচয়ই একটি রাষ্ট্রের ভিত্তি হতে পারে না; ভাষা ও সংস্কৃতিও জাতীয়তার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। দ্বি-জাতি তত্ত্বের ঐতিহাসিক বিতর্ক আজও উপমহাদেশীয় রাজনীতিতে বিদ্যমান।

